সুদানের গৃহযুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুটেরেস শুক্রবার রাতের শেষ দিকে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছেন। গুটেরেসের এই আবেদনটি ইউএন নিরাপত্তা পরিষদের সামনে উপস্থাপিত হয়, যেখানে তিনি মানবিক সংকটের মাত্রা বিশ্বে সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করেন।
সুদানের প্রধানমন্ত্রী কামিল ইদ্রিস সোমবার নিরাপত্তা পরিষদে একটি শান্তি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন, যার মূল বিষয় ছিল পারামিলিটারি র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (RSF)কে অস্ত্রহীন করা। তবে RSF এই প্রস্তাবকে “ইচ্ছাপূরণ” বলে প্রত্যাখ্যান করে, যা সংঘাতের সমাধানে বড় বাধা হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
যুদ্ধের সূচনা এপ্রিল ২০২৩-এ, যখন সুদানের সেনাবাহিনী ও RSF-র মধ্যে ক্ষমতার লড়াই তীব্র হয়ে ওঠে। তখন থেকে দেশটি বিশাল মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে; প্রায় ৯.৬ মিলিয়ন মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে স্থানচ্যুত হয়েছে এবং ৪.৩ মিলিয়ন নাগরিক প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ৩০.৪ মিলিয়ন সুদানি নাগরিককে মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের সহ-সচিব মোহাম্মদ খালেদ খিয়ারি নিরাপত্তা পরিষদে উল্লেখ করেন, শুষ্ক মৌসুমের আগমনে সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার আশঙ্কা বাস্তবায়িত হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিদিনের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতা ও ধ্বংসের মাত্রা বেড়েছে, আর সাধারণ মানুষ অস্বীকারযোগ্য কষ্টের মুখোমুখি।
সম্প্রতি সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু কোরডোফানের মধ্যভাগে স্থানান্তরিত হয়েছে। ৮ ডিসেম্বর RSF হেগলিগ তেলক্ষেত্র দখল করে, যা তেল উৎপাদনের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই দখলকে প্রতিক্রিয়ায় দক্ষিণ সুদানের সেনাবাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে তেলক্ষেত্র রক্ষা করতে প্রবেশ করে, যা সংঘাতের আঞ্চলিক মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে।
একই সময়ে RSF উত্তর দারফুরের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ২৪ ডিসেম্বর থেকে তারা চাদের সীমানার নিকটবর্তী দর জাগা অঞ্চলকে লক্ষ্য করে একাধিক আক্রমণ চালায়, যা শরণার্থীদের জন্য শেষ পালানোর পথটি বন্ধ করার হুমকি তৈরি করে।
সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হিংসা ছড়িয়ে পড়ার ফলে শুক্রবার একটি ড্রোন হামলায় চাদের সামরিক ক্যাম্পে দুই চাদীয় সৈন্যের মৃত্যু ঘটেছে। চাদের সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার মতে, ড্রোনটি সুদানের ভূখণ্ড থেকে উৎক্ষেপিত হয়। এই ঘটনা সংঘাতের সীমান্ত পারাপারকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, হেগলিগ তেলক্ষেত্রের দখল এবং দক্ষিণ সুদানের হস্তক্ষেপ উভয়ই সংঘাতকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে, যেখানে অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং জাতীয় নিরাপত্তা একসাথে জড়িয়ে আছে। একই সঙ্গে, উত্তর দারফুরে RSF-এর আক্রমণ শরণার্থীদের চাদে ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশে প্রবেশের বিকল্প পথকে সংকুচিত করছে, যা মানবিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এখন এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। গুটেরেসের অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বানকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সমন্বিত মানবিক সহায়তা ও রাজনৈতিক সমাধানের প্রস্তাবনা গড়ে উঠছে। যদিও RSF-এর প্রত্যাখ্যানের ফলে শান্তি প্রক্রিয়া জটিল হয়েছে, তবু ইউএন সদস্য দেশগুলোকে এই সংকটের সমাধানে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বৈশ্বিক পর্যবেক্ষকরা এই মুহূর্তে সুদানের সংঘাতকে আফ্রিকায় মানবিক সংকটের শীর্ষে স্থাপন করেছেন, এবং উল্লেখ করেন যে শুষ্ক মৌসুমে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে লক্ষ লক্ষ মানুষ অতিরিক্ত দুর্ভোগের মুখে পড়তে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ত্বরিত হস্তক্ষেপ এবং মানবিক সাহায্যের প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
সুদানের গৃহযুদ্ধের বর্তমান অবস্থা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং সীমান্ত পারাপার ঘটনার সমন্বয় ভবিষ্যতে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে। গুটেরেসের যুদ্ধবিরতির আহ্বান এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিক্রিয়া কিভাবে বিকশিত হবে, তা সুদানের জনগণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



