থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়া ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ দুপুর ১২টায় (স্থানীয় সময়) তাত্ক্ষণিক অস্ত্রবিরতির শর্তে এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের দ্বারা জারি করা যৌথ বিবৃতিতে সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহার, নাগরিক ও অবকাঠামোতে আক্রমণ, এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সমঝোতা অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞা দেশের সমগ্র সীমান্তে প্রযোজ্য হবে এবং তা ১২:০০ অপরাহ্ন (০৫:০০ GMT) থেকে কার্যকর হবে। চুক্তিতে উভয় পক্ষের সৈন্যবাহিনীর চলাচল স্থগিত করা এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের দ্রুত বাড়ি ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সীমান্তে চলমান সব ধরনের সামরিক কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ হবে এবং কোনো ধরণের সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে যৌথভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি, মাইন পরিষ্কারের কাজেও সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘর্ষে জমে থাকা বিস্ফোরক পদার্থের ঝুঁকি কমাবে। এই পদক্ষেপগুলো সীমান্তে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রাখে।
এই সমঝোতার পটভূমিতে রয়েছে মাসের শুরুর দিকে পুনরায় জ্বলে ওঠা সীমান্ত সংঘাত, যা পূর্বে স্বাক্ষরিত চুক্তি ভেঙে দিয়েছিল। সরকারী তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতে অন্তত ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। সংঘাতের মূল কারণ ছিল ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত প্রাচীন মন্দির ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর মালিকানা নিয়ে মতবিরোধ। এই অঞ্চলে অস্ত্রবিরতি না থাকায় বেসামরিক জনগণ প্রায়ই সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে।
সীমান্তে সৃষ্ট বিশাল মানবিক সংকটের ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং প্রতিবেশী দেশগুলো দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানায়। আসিয়ান (ASEAN) দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের জরুরি বৈঠকের পর থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া উভয়ই এই চুক্তি স্বাক্ষর করে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং মালয়েশিয়া সহ বেশ কয়েকটি দেশও দুই দেশের মধ্যে শান্তি বজায় রাখতে চাপ দেয় এবং সমঝোতার পক্ষে সমর্থন জানায়। এই বহুপাক্ষিক চাপের ফলে দুই দেশই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
জুলাই মাসে একই সীমান্তে পাঁচ দিনের তীব্র লড়াইয়ের পর একটি অস্থায়ী চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছিল, তবে তা মাত্র কয়েক দিনই টিকতে পারেনি। সেই সময়ের সমঝোতা দ্রুত ভেঙে যায় এবং আবার অস্ত্রবিরতি ভঙ্গ হয়, যা পুনরায় মানবিক সংকটকে তীব্র করে তুলেছিল। এই ব্যর্থতা থেকে শিখে উভয় দেশই এখন দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের দিকে মনোনিবেশ করেছে। তাত্ক্ষণিক অস্ত্রবিরতি চুক্তি এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য ইতিবাচক সংকেত বহন করে। সীমান্তে অস্ত্রবিরতি বজায় রাখলে বাণিজ্যিক পথ পুনরায় চালু হবে এবং উভয় দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্বস্তি আসবে। এছাড়া, মাইন পরিষ্কারের যৌথ উদ্যোগ ভবিষ্যতে কৃষি ও পর্যটন শিল্পের পুনরুজ্জীবনে সহায়তা করবে। সাইবার নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা দুই দেশের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোকে শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অবিলম্বে কার্যকর হওয়া এই চুক্তি স্থানীয় জনগণের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে এবং শরণার্থীদের স্বেচ্ছায় বাড়ি ফেরার সুযোগ দেবে। সরকারী সূত্র অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে পুনর্নির্মাণ কাজ এবং মৌলিক সেবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা দ্রুততর হবে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোও এই সুযোগে সহায়তা প্রদান করতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে, চুক্তির সাফল্য নির্ভর করবে উভয় পক্ষের বাস্তবায়ন ক্ষমতা এবং পর্যবেক্ষণ মেকানিজমের কার্যকারিতার ওপর।
ভবিষ্যতে, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া দু’দেশই সমঝোতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত সংলাপ এবং পর্যবেক্ষণ মিশন চালু করার পরিকল্পনা করেছে। আসিয়ানের সমর্থনে একটি ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে অস্ত্রবিরতির বাস্তবায়ন ও মানবিক পুনর্বাসনের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে। এই প্রক্রিয়া যদি সফল হয়, তবে তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য সীমান্ত বিরোধের সমাধানে মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে। শেষ পর্যন্ত, তাত্ক্ষণিক অস্ত্রবিরতি এবং সহযোগিতামূলক পদক্ষেপগুলোই স্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।



