ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫ রাতের সময় ময়মনসিংহের ভলুয়ার জেলায় গার্মেন্টস কর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে একদল লোক গুলিয়ে হত্যা করে। দাশের দেহ জাতীয় সড়কের মাঝপথে পুড়িয়ে ফেলা হয়, যেখানে আগুনের ধোঁয়া ও গর্জন শোনা যায়। তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে তাকে ফেসবুকে ইসলাম ধর্মের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ তোলা হয়, তবে পরে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ময়মনসিংহের র্যাব-১৪ কমান্ডার জানিয়েছেন, দাশের সামাজিক মিডিয়া অ্যাকাউন্টে কোনো আপত্তিকর পোস্টের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে, আশেপাশের কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা কোনো নির্দিষ্ট কাজের উল্লেখ করতে পারেননি, যা তাকে গোষ্ঠীর আক্রমণের জন্য যথাযথ কারণ হতে পারত। ফলে, অভিযোগটি একধরনের গুজবের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বলে মনে হচ্ছে।
দাশের সম্প্রদায় রাবিদাস, যা বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে চামড়া কাজের সঙ্গে যুক্ত এবং সামাজিকভাবে অবহেলিত। রাবিদাস সম্প্রদায়ের সাধারণত নিম্নবর্ণের পরিচয় থাকে এবং তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য প্রায়ই গৃহহত্যা ও হিংসা ঘটায়। বাঙ্গালাদেশ দালিত ও বাদ পড়া অধিকার আন্দোলনের (BDERM) সাধারণ সম্পাদক শিপন কুমার রাবিদাসের মতে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কর্মস্থলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং গহীন বর্ণগত বৈষম্য উভয়ই ভূমিকা রেখেছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, দাশের সহকর্মীরা তার কাজের প্রতি ঈর্ষা পোষণ করত এবং তার সঙ্গে কিছু বেতন ও পদোন্নতি সংক্রান্ত বিরোধ ছিল। একই সঙ্গে, রাবিদাস সম্প্রদায়ের সদস্যদের প্রতি সামাজিক অবহেলা ও ধর্মীয় গুজবের মিশ্রণ ঘটিয়ে গোষ্ঠীকে নিন্দা করার পরিবেশ তৈরি হয়। এই দুই দিকের মিশ্রণই শেষ পর্যন্ত দাশের গৃহহত্যার দিকে নিয়ে যায়।
স্থানীয় পুলিশ দাশের মৃত্যুর তদন্তে রাবি (র্যাব) ও স্থানীয় থানা দু’টি দফা গঠন করেছে। রাবি কমান্ডার উল্লেখ করেছেন, তদন্তের প্রথম পর্যায়ে কোনো ডিজিটাল প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং গ্যাংস্টারদের সঙ্গে সংযোগের কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। তবে, গৃহহত্যার সময় উপস্থিত থাকা কয়েকজন সাক্ষীর বিবরণ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তাদের বিবৃতি অনুযায়ী গোষ্ঠীটি দ্রুতই দাশকে ধরতে এবং তার দেহকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে সমবেত হয়।
অধিক তদন্তের জন্য ময়মনসিংহের জেলা আদালতে মামলাটি দাখিল করা হয়েছে। আদালত এখন পর্যন্ত দাশের মৃত্যুর দায়ী ব্যক্তিদের সনাক্ত করার জন্য ফৌজদারি তদন্তের আদেশ দিয়েছে এবং রাবি ও থানা দু’টি দফা একসঙ্গে কাজ করছে। আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, গোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গৃহহত্যা, অশান্তি সৃষ্টিকরণ এবং ধর্মীয় গুজবের মাধ্যমে হিংসা উস্কে দেওয়ার অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দাশের পরিবার ও রাবিদাস সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা দাবি করে, সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি দ্রুত পদক্ষেপ নেবে এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করবে। তারা একই সঙ্গে সামাজিক বৈষম্য ও ধর্মীয় গুজবের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের হিংসা রোধ করা যায়।
এই ঘটনার পর, মানবাধিকার সংস্থা ও দালিত অধিকার আন্দোলন গোষ্ঠী একত্রে প্রতিবাদসূচক র্যালি ও সমাবেশের পরিকল্পনা করেছে। তারা দাবি করে, রাবিদাস সম্প্রদায়ের প্রতি অবিচার ও বর্ণগত বৈষম্য বন্ধ করা এবং ধর্মীয় গুজবের ভিত্তিতে গৃহহত্যা বন্ধ করা জরুরি। সরকারকে এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সংহতি বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, দীপু চন্দ্র দাসের গৃহহত্যা ধর্মীয় গুজব, কর্মস্থলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বর্ণগত বৈষম্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। তদন্ত চলমান থাকায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপের প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যাতে দাশের পরিবার ন্যায়বিচার পায় এবং একই ধরনের হিংসা আর না ঘটে।



