২০২৫ সালে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে কাজ করা ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডিপোর্টেশন সৌদি আরব থেকে ঘটেছে। মোট ২৪,৬০০ ভারতীয়কে ৮১টি দেশ থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে সৌদি আরব থেকে ১১,০০০ জনের ডিপোর্টেশন সর্বোচ্চ।
মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ডিপোর্টেশনগুলো মূলত ভিসা মেয়াদ শেষ হওয়া, কাজের অনুমতি না থাকা অথবা শ্রম নীতির লঙ্ঘনের কারণে হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশে দীর্ঘমেয়াদী ভিসা ধারকরা কাজের শর্ত পূরণ না করলে স্থানীয় আইন অনুসারে ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সৌদি আরবের ডিপোর্টেশন সংখ্যা ১১,০০০-এ পৌঁছেছে, যা পূর্বের পাঁচ বছরের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩,৮০০ ভারতীয়কে ডিপোর্ট করা হয়েছে, যা পূর্বে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডিপোর্টেশন হিসেবে বিবেচিত হয়। মিয়ানমার থেকে ১,৫৯১, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১,৪৬৯, বাহরাইন থেকে ৭৬৪, মালয়েশিয়া থেকে ১,৪৮৫, থাইল্যান্ড থেকে ৪৮১ এবং কম্বোডিয়া থেকে ৩০৫ জন ভারতীয়কে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ডিপোর্টেশনগুলোর পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, ভিসার মেয়াদ দীর্ঘ সময়ের জন্য বাড়িয়ে নেওয়া হলেও কাজের অনুমতি না থাকায় শ্রমিকদের আইনগত অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়া, কিছু কর্মী শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন, যেমন বেতন না দেওয়া বা কাজের সময় অতিরিক্ত হওয়া, ফলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। মিয়ানমার ও কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে, ডিপোর্টেড ব্যক্তিরা সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত অবৈধ কাজের অভিযোগে ধরা পড়ে, যা তাদের ডিপোর্টের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই ডিপোর্টেশনগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দু’দেশের মধ্যে শ্রমিক চুক্তি ও বিনিয়োগ চুক্তি দীর্ঘদিনের সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলেছে, তবে শ্রমিকদের অধিকার ও বৈধ কর্মসংস্থানের বিষয়টি এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একটি কূটনৈতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “সৌদি আরবের শ্রম নীতি কঠোর হওয়ায় ভারতীয় কর্মীদের জন্য যথাযথ কাজের অনুমতি ও ভিসা নিয়ম মেনে চলা অপরিহার্য, নতুবা ডিপোর্টেশন বাড়তে পারে।”
যুক্তরাষ্ট্রে ডিপোর্টেশন সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য, যদিও সৌদি আরবের তুলনায় কম। ডিপোর্টেডদের বেশিরভাগই বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত ছিলেন, যেখানে কাজের অনুমতি না থাকা বা ভিসা মেয়াদ শেষ হওয়া প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র-ভারত দ্বিপাক্ষিক শ্রম নীতির পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
মিয়ানমার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার ডিপোর্টেশনগুলোও একই ধাঁচের সমস্যার প্রতিফলন। ভিসা মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া, কাজের অনুমতি না থাকা এবং শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে এই দেশগুলোতে ডিপোর্টেশন ঘটেছে। বিশেষ করে মিয়ানমার ও কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে সাইবার অপরাধের অভিযোগে ডিপোর্টেডদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি, যা আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সংযুক্ত।
ডিপোর্টেশন ডেটা প্রকাশের পর, ভারতীয় কূটনৈতিক মন্ত্রণালয় কর্মসংস্থান নীতি ও বিদেশে কাজ করা নাগরিকদের সুরক্ষা বাড়ানোর জন্য নতুন নির্দেশিকা প্রস্তুত করার কথা জানিয়েছে। বিশেষত, ভিসা ও কাজের অনুমতি সংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, শ্রমিক অধিকার রক্ষার জন্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তি শক্তিশালী করা এবং অবৈধ সাইবার কাজের বিরুদ্ধে সতর্কতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ভবিষ্যতে, ডিপোর্টেশন সংখ্যা কমাতে ভারত ও গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন হবে। কূটনৈতিক স্তরে শ্রমিক সুরক্ষা, কাজের অনুমতি এবং ভিসা নীতির সমন্বয় করা, পাশাপাশি কর্মী প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো সফল হলে, বিদেশে কাজ করা ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নিরাপদ ও স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার সম্ভাবনা বাড়বে।



