বুকিংহাম প্যালেসের কিংস গ্যালারিতে রাণী এলিজাবেথ দ্বিতীয়ের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে একটি নতুন প্রদর্শনী উদ্বোধন করা হয়েছে। এই প্রদর্শনীতে রাণীর সত্তর বছরের শাসনকালে পরিধান করা প্রায় দুইশোটি পোশাক, গহনা, টুপি, জুতা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিস অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রদর্শনীটি দশ দশকের ঐতিহাসিক পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে, যেখানে প্রতিটি সময়ের ফ্যাশন এবং সামাজিক প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। পোশাকের পাশাপাশি রাণীর ব্যক্তিগত গয়না ও আনুষঙ্গিক সামগ্রীও দর্শকদের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে, যা তার রাজারূপে এবং ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতেন তা জানায়।
প্রদর্শনীতে বিশেষভাবে পাঁচটি সবচেয়ে পরিচিত পোশাককে আলাদা করে তুলে ধরা হয়েছে। এই পাঁচটি পোশাকের মধ্যে রয়েছে রাণীর প্রারম্ভিক দশকের টুইড ও টার্টান সমন্বয়, তার রাজকীয় অনুষ্ঠানের গাউন, সামরিক ইউনিফর্ম, উজ্জ্বল রঙের কোচ এবং একটি ঐতিহ্যবাহী হেডস্কার্ফ।
প্রথম উল্লেখযোগ্য সমন্বয়টি হল ১৯৫০-এর দশকে নরম্যান হার্টনেল ডিজাইন করা হ্যারিস টুইড জ্যাকেট এবং বালমোরাল টার্টান স্কার্ট। রাণী প্রথমবার এই পোশাকটি পরিধান করেন যখন তিনি আউটডোর কার্যকলাপে অংশ নিতেন। টুইডের টেকসই গঠন এবং টার্টানের ঐতিহ্যবাহী নকশা তাকে প্রকৃতির সঙ্গে সহজে মিশে যেতে সাহায্য করত।
এই সমন্বয়ের পেছনে ছিল ব্রিটিশ টেক্সটাইল শিল্পকে সমর্থন করার একটি সুক্ষ্ম উদ্দেশ্য। টুইড ও টার্টানের ব্যবহার দেশের উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মানকে তুলে ধরতে সহায়তা করত, একই সঙ্গে রাণীর শাসনের স্থিতিশীলতা এবং নরম শক্তির বার্তা পৌঁছে দিত।
রাণীর ফ্যাশন কখনোই হঠাৎ করে পরিবর্তনশীল ট্রেন্ড অনুসরণ করত না; তার পোশাকের শৈলী সবসময় ঐতিহ্যবাহী এবং সংযত রইত। এই ধারাবাহিকতা তাকে জনগণের চোখে একটি নির্ভরযোগ্য এবং স্থিতিশীল শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করত, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই টুইড-টার্টান সমন্বয়টি ব্রিটিশ স্টাইলের একটি আইকন হয়ে ওঠে এবং বহু ডিজাইনারের সৃষ্টিতে প্রভাব ফেলেছে। আধুনিক ফ্যাশন জগতে এর ছাপ স্পষ্ট, বিশেষ করে ইতালীয় লাক্সারি ব্র্যান্ড মিউ মিউ ২০২৪ সালের বালমোরাল সংগ্রহে টার্টানের পুনর্নবীকরণ দেখা যায়।
প্রদর্শনী কিউরেটর ক্যারোলিন ডি গুইটো উল্লেখ করেছেন যে রাণীর পোশাকের মাধ্যমে ব্রিটেনের পরিবর্তনশীল সামাজিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম বার্তা প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, রাণীর পোশাকের পছন্দ কেবল সৌন্দর্য নয়, বরং কূটনৈতিক বার্তা বহন করে।
অন্যান্য চারটি আইকনিক পোশাকের মধ্যে রয়েছে তার করোনেশন গাউন, যা তার শাসনের সূচনা চিহ্নিত করে; একটি সোনার স্টেট ড্রেস, যা রাজকীয় অনুষ্ঠানগুলিতে পরিধান করা হতো; একটি সামরিক ইউনিফর্ম, যা তার সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করত; এবং একটি উজ্জ্বল রঙের কোচ, যা তার পাবলিক ইভেন্টে উপস্থিতি আরও আকর্ষণীয় করে তুলত।
এই সব পোশাকের মাধ্যমে রাণী এলিজাবেথের ব্যক্তিগত রুচি এবং রাজকীয় দায়িত্বের মধ্যে সূক্ষ্ম সমন্বয় স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। প্রতিটি জিনিসের পেছনে ছিল তার শাসনকালে ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নীতি, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিফলন।
প্রদর্শনীটি দর্শকদেরকে রাণীর শৈলী এবং তার সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার সুযোগ দেয়। গ্যালারির ভেতরে সাজানো প্রতিটি আইটেমের মাধ্যমে দর্শকরা রাণীর জীবনের বিভিন্ন দিক, তার শাসনের স্থিতিশীলতা এবং ব্রিটিশ ফ্যাশনের বিকাশ সম্পর্কে গভীর ধারণা পেতে পারেন।
বুকিংহাম প্যালেসের কিংস গ্যালারিতে এই ঐতিহাসিক সংগ্রহের প্রদর্শনী রাণী এলিজাবেথের উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যা তার শাসনকালের সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবকে পুনরায় মূল্যায়ন করার সুযোগ প্রদান করে।



