হিমালয়ের উচ্চ শৃঙ্গের ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ মিটার উচ্চতায় বসবাসরত একটি বিরল উদ্ভিদ, তিন দশকের পর আবার ফুল ফোটাতে দেখা গেছে। স্থানীয় নাম ‘চুকা’ এবং বৈজ্ঞানিক নাম রিউম নোবাইল (Rium nobilis) হিসেবে পরিচিত এই ফুলটি উত্তর‑পূর্ব আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, তিব্বত এবং মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে পাওয়া যায়। এই বছর প্রথমবারের মতো পূর্বাভাসের চেয়ে বেশ কিছু সপ্তাহ আগে ফুলের দৃশ্য দেখা গিয়েছে, যা বিজ্ঞানী ও পর্যটকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
হিমালয়ের উপত্যকা সাধারণত শীতের তুষার চাদর সরিয়ে নিলে রঙিন ফুলের সমারোহে রূপান্তরিত হয়। তবে এই বছর, ঐ সমারোহের আগে ‘চুকা’ ফুলের উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তীব্র শীতলতা ও পরিষ্কার আকাশের মেলবন্ধনে, উপত্যকার সবুজে এক স্বচ্ছ টাওয়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা এই ফুলটি দৃশ্যমানতা বাড়িয়ে তুলেছে।
ফুলের গঠন বিশেষভাবে নজরকাড়া। প্রতিটি কুঁড়ি স্বচ্ছ পাতলা ব্র্যাক্টে ঘেরা, যার প্রান্তে হালকা গোলাপি রঙের রেখা দেখা যায়। এই স্বচ্ছ আবরণ ফুলকে কাচের মতো ঝলমলে করে তুলেছে, ফলে সূর্যালোকে আলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে দূর থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। গাছটি প্রায় দুই মিটার লম্বা হয়ে, এক ধরনের প্যাগোডার মতো কাঠামো গঠন করে, যা পাহাড়ের ঢালে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
উচ্চ উচ্চতায় বসবাসের জন্য এই উদ্ভিদটি বিশেষভাবে অভিযোজিত। শীতল পরিবেশে দীর্ঘায়ু বজায় রাখতে এটি বহুবর্ষজীবী এবং শীতল তাপমাত্রায়ই বৃদ্ধি পায়। গাছের মূল কাঠামোতে পরিবর্তিত পাতা, অর্থাৎ ব্র্যাক্ট, ফুলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আলো সংগ্রহ করে, ফলে ফুলের উজ্জ্বলতা বজায় থাকে। এই বৈশিষ্ট্যই এটিকে অন্যান্য উচ্চশ্রেণীর উদ্ভিদ থেকে আলাদা করে।
‘চুকা’ ফুলের জীবনচক্র দীর্ঘ। গাছটি প্রায় সাত থেকে ত্রিশ বছর পর্যন্ত নীরবে শক্তি সঞ্চয় করে, তারপর একবারের জন্য তার জীবনীশক্তি প্রকাশ করে ফুল ফোটায়। এই সময়কালে গাছটি দৃশ্যমান না হলেও মাটির নিচে শিকড়ের মাধ্যমে পুষ্টি সংগ্রহ করে। একবার শক্তি সঞ্চিত হলে, একক বা একাধিক কুঁড়ি একসাথে ফুটে উঠে, যা এক উজ্জ্বল আলোর স্তম্ভের মতো দৃশ্য তৈরি করে।
এই উদ্ভিদটি হিমালয়ের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত, যার বিস্তৃতি উত্তর‑পূর্ব আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের কিছু অংশ, নেপাল, ভুটান, তিব্বত এবং মিয়ানমার পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। যদিও উচ্চ উচ্চতায় সীমাবদ্ধ, তবে এর স্বচ্ছ ব্র্যাক্টের উজ্জ্বলতা মাইলের পর মাইল উপত্যকা জুড়ে দৃশ্যমান হয়, যা স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের জন্য এক অনন্য প্রাকৃতিক দৃশ্য তৈরি করে।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই উদ্ভিদটি হিমালয়ের কঠোর পরিবেশে অভিযোজনের একটি চমৎকার উদাহরণ। স্বচ্ছ ব্র্যাক্টের মাধ্যমে আলো গ্রহণের ক্ষমতা, দীর্ঘ সময় শক্তি সঞ্চয় করার বৈশিষ্ট্য এবং উচ্চ উচ্চতায় বেঁচে থাকার ক্ষমতা, সবই গবেষকদের জন্য মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করে। একই সঙ্গে, এই ফুলের অপ্রত্যাশিত আগমন স্থানীয় পর্যটন শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে।
অবশেষে, ‘চুকা’ ফুলের পুনরায় ফুটো হিমালয়ের পরিবেশগত ভারসাম্যের সূচক হতে পারে। এই ধরনের বিরল উদ্ভিদ পর্যবেক্ষণ করে আমরা পরিবর্তনশীল জলবায়ু ও উচ্চশ্রেণীর বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের সম্পর্কে ধারণা পেতে পারি। তাই, হিমালয়ের এই উচ্চশ্রেণীর অঞ্চলগুলোতে গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এমন অনন্য প্রজাতিগুলি সুরক্ষিত থাকে।



