উক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কি শুক্রবার টেলিগ্রাম মাধ্যমে জানিয়েছেন যে রাশিয়া বেলারুশের ভূখণ্ডে সাধারণ পাঁচতলা অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে সরঞ্জাম স্থাপন করে উক্রেনের লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ চালাচ্ছে এবং কিয়েভের বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাচ্ছে।
জেলেনস্কি একটি সামরিক স্টাফ মিটিংয়ের পর এই মন্তব্য করেন, যেখানে তিনি রাশিয়ার কৌশলকে বেলারুশের সীমান্ত পার হয়ে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা অবস্থানকে বাইপাস করার প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ বেলারুশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে বেলারুশ তার সার্বভৌমত্বকে রাশিয়ার আক্রমণাত্মক ইচ্ছার সামনে ত্যাগ করছে, যা দেশটির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ।
উক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা পর্যবেক্ষণ করেছে যে বেলারুশের সীমান্তের নিকটবর্তী বসতিগুলিতে, বিশেষত বাসস্থানিক ভবনে, রাশিয়ান সামরিক সরঞ্জাম স্থাপন করা হচ্ছে। এই সরঞ্জামগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টেনা এবং অন্যান্য যোগাযোগ উপকরণ, যা ড্রোনের পথনির্দেশে ব্যবহৃত হয়।
বিশেষ করে পাঁচতলা অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে স্থাপিত অ্যান্টেনা ও রাডারগুলোকে জেলেনস্কি ‘শাহেড’ ড্রোনকে পশ্চিম ইউক্রেনের লক্ষ্যবস্তুতে নির্দেশ করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। এই ড্রোনগুলো ইতিমধ্যে বহু বেসামরিক এলাকায় ক্ষতি করেছে।
জেলেনস্কি এই পরিস্থিতিকে মানবিক জীবনকে উপেক্ষা করার কাজ হিসেবে বর্ণনা করে, মিনস্ককে এই ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে বেলারুশের নাগরিকদের নিরাপত্তা রাশিয়ার আক্রমণাত্মক পরিকল্পনার শিকার হতে পারে।
রাশিয়া ও বেলারুশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এই অভিযোগের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি, এবং উভয় পক্ষই অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
ইতিহাসে রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বেলারুশের ভূখণ্ড থেকে ইউক্রেনের ওপর আক্রমণ চালায়, এবং বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেনকো কোনো সৈন্য পাঠাবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েও রাশিয়ার কৌশলগত অংশীদার হিসেবে অবস্থান বজায় রেখেছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দুই গবেষকের বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে রাশিয়া পূর্ব বেলারুশের একটি প্রাক্তন বিমানবেসে ওরেশনিক নামের হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করার পরিকল্পনা করছে। এই তথ্য রয়টার্সের একচেটিয়া প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।
ওরেশনিক সিস্টেম নিউক্লিয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন এবং ইউরোপের বিস্তৃত অঞ্চলে কয়েক মিনিটের মধ্যে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম, যা ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর জন্য কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে বেসামরিক অবকাঠামোকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন এবং বেলারুশকে সরাসরি প্রতিশোধের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বেলারুশের এই অংশগ্রহণকে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মিনস্কের সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে বলে সতর্কতা প্রকাশ করেছে।
এই ঘটনা ইউক্রেনের সংঘাতের ভৌগোলিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করে, যেখানে যুদ্ধের লাইন এখন কেবল ফ্রন্টলাইনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ভূখণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে কিয়েভ তার বায়ু প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্বিবেচনা করে বেলারুশ থেকে আসা হুমকির মোকাবিলায় উত্তরাঞ্চলীয় সেক্টরে অতিরিক্ত ইন্টারসেপ্টর স্থাপন করতে পারে।
যুদ্ধের তৃতীয় বর্ষে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষ নতুন কৌশলগত পথ অনুসন্ধান করছে, এবং বেলারুশের ভূমিকা এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।



