উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে, উভয় দেশের সম্পর্ককে ইউক্রেন যুদ্ধের রক্ত, জীবন ও মৃত্যুর ভাগাভাগি দিয়ে দৃঢ়তর বলে উল্লেখ করেছেন। এই বার্তা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (KCNA) শনিবার প্রকাশ করে, যেখানে ২০২৫ সালকে দ্বিপাক্ষিক বন্ধনের জন্য বিশেষ অর্থবহ বছর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিমের এই মন্তব্যের পূর্বে পুতিন ১৮ ডিসেম্বর কিমকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা পাঠিয়ে, রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্স্ক অঞ্চলে উত্তর কোরিয়ার সৈন্যদের ‘বীরত্বপূর্ণ’ ভূমিকা ও দুই দেশের অটুট বন্ধুত্বের প্রশংসা করেন।
পুতিনের শুভেচ্ছায় রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতাকে ‘ইতিহাসের সাক্ষী’ হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং কুর্স্কে চলমান সামরিক কার্যক্রমে কোরিয়ার অংশগ্রহণকে প্রশংসা করা হয়। এই বার্তা দুই দেশের নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক সমর্থনের প্রকাশ হিসেবে বিশ্লেষকরা দেখেছেন।
কিমের নতুন বছরের বার্তায় ২০২৫কে “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ” বছর হিসেবে উল্লেখ করে, মস্কো ও প্যংয়াংয়ের সম্পর্ককে “একটি অমূল্য সাধারণ সম্পদ” বলে বর্ণনা করা হয়েছে, যা বর্তমান সময়ের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও সংরক্ষিত থাকবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, দুই দেশের জনগণের ঐক্য ও বন্ধন এখন আর কোনো বাহ্যিক শক্তি ভাঙতে পারবে না।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়োহ্যাপ সংবাদ সংস্থা এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলি জানিয়েছে যে উত্তর কোরিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়াকে সহায়তা করতে হাজারো সৈন্য পাঠিয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে, কোরিয়ার সামরিক উপস্থিতি রাশিয়ার সামরিক কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উত্তর কোরিয়া এপ্রিল মাসে স্বীকার করে যে, রাশিয়ার ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে তার সৈন্যদের পাঠানো হয়েছে এবং সেই সময়ে কিছু সৈন্য যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছে। এই স্বীকৃতি পূর্বে গোপনীয়ভাবে ধরা পড়া তথ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
এই মাসের শুরুর দিকে কিম জং উন স্বীকার করেন যে, আগস্ট ২০২৫-এ রাশিয়ার কুর্স্ক অঞ্চলে ইউক্রেনের আক্রমণের পর উত্তর কোরিয়ার ইঞ্জিনিয়ার রেজিমেনের সৈন্যদের মাইন পরিষ্কারের কাজের জন্য পাঠানো হয়েছিল। ১২০ দিনের মিশনের সময় নূন্যতম নয়জন সৈন্য নিহত হয়েছেন, যা উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহায়তার বাস্তবিক দিককে স্পষ্ট করে।
কিমের নতুন বছরের শুভেচ্ছা পাঠানোর এক দিন পরে তিনি দেশের মিসাইল উৎপাদন বাড়াতে এবং মুনিসন উৎপাদনের জন্য নতুন কারখানা গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশনা দেশের রকেট ও মিসাইল শিল্পকে দ্রুত সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়া মিসাইল পরীক্ষা বাড়িয়ে চলেছে; বিশ্লেষকরা বলেন, এই পরীক্ষাগুলো স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ পরিসরের রকেটের নির্ভুলতা বাড়িয়ে সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। মিসাইলের উন্নত প্রযুক্তি ও উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ার ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন চ্যালেঞ্জ উত্থাপিত হতে পারে।
দুই দেশের এই ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে, বিশেষ করে ইউক্রেনের সংঘাতের প্রসঙ্গে রাশিয়ার সমর্থন বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে। ভবিষ্যতে কিমের নির্দেশনা অনুসারে মিসাইল উৎপাদন ও পরীক্ষার তীব্রতা বাড়লে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোর উপর প্রভাব পড়তে পারে।
সামগ্রিকভাবে, কিম জং উনের পুতিনকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা এবং রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া, দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত বন্ধনের পুনর্ব্যক্তি হিসেবে দেখা যায়। এই উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন গতিপ্রকোপ সৃষ্টি করতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক আলোচনার ও নিরাপত্তা নীতির পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলবে।



