কুয়ালালামপুরের উচ্চ আদালত গত মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান করে, যেখানে রে.কোহ নামে একজন পাস্টরকে পুলিশের গোপন অপহরণে জড়িত বলে ঘোষিত করা হয়। রে.কোহের স্ত্রী সুসান্না লিউ, ৬৯ বছর বয়সী, আদালতে এই রায়কে “ঐতিহাসিক ও আবেগপূর্ণ” বলে বর্ণনা করেন। রায়ের ভিত্তিতে মালয়েশিয়ার বিশেষ শাখা পুলিশ এবং সরকারকে দেশের প্রথম জোরপূর্বক অদৃশ্যতা মামলায় দায়ী করা হয়েছে।
প্রায় নয় বছর আগে, ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় রে.কোহ তার পারিবারিক বাড়ি থেকে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে বের হন। কুয়ালালামপুরের একটি শান্ত পাড়া থেকে গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে আসার মুহূর্তে একদল মাস্কধারী ব্যক্তি, সাদা গাড়ি ও মোটরসাইকেলের কনভয় নিয়ে তার গাড়িতে আক্রমণ করে। গ্লাসের টুকরো ছড়িয়ে পড়ে, এবং পাস্টরকে জোরপূর্বক গাড়ি থেকে বের করে একটি গাড়িতে বসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযানের সময় ঘটনাটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সম্পন্ন হয়, ফলে গাড়ি চালিয়ে যাওয়া এক গাড়ি চালকের মতে এটি সিনেমার দৃশ্যের মতো দেখায়। এই চোখে দেখা সাক্ষী পরে আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন যে তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন কোনো চলচ্চিত্রের শুটিং চলছে।
অপরাধের পর রে.কোহের সন্তানরা তৎক্ষণাৎ তার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করে, এবং পরিবার দ্রুত পুলিশে অভিযোগ দায়ের করে। তবে তদন্তের অগ্রগতি ধীরগতিতে চলার ফলে মামলাটি দীর্ঘ সময়ের জন্য অমীমাংসিত রয়ে যায়।
সুসান্না লিউ এই ঘটনার পর থেকে পাস্টরের স্বামীকে খুঁজে বের করার জন্য একাধিক আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি সাধারণ পাস্টরের স্ত্রীর ভূমিকা থেকে এক দৃঢ় মানবাধিকার কর্মী ও ক্যাম্পেইনারের ভূমিকায় রূপান্তরিত হন। তার প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও স্থানীয় নাগরিক সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
বছরের পর বছর ধরে লিউ বিভিন্ন আদালতে রে.কোহের গৃহীত ন্যায়বিচার দাবি করে মামলা দায়ের করেন। শেষ পর্যন্ত, কুয়ালালামপুরের উচ্চ আদালত তার দাবিকে স্বীকৃতি দিয়ে রে.কোহের নিখোঁজ হওয়া একটি গুরুতর অন্যায়ের ফলাফল বলে রায় দেয়। আদালত বিশেষ শাখা পুলিশের গোপন অপহরণকে স্বীকার করে এবং সরকারকে এই ঘটনায় দায়ী করে।
রায়ের পর লিউ আদালতে একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন, যেখানে তিনি বলেন যে তিনি দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেছেন এবং এখন পুরো পৃথিবীকে সত্য জানাতে চান। তিনি বলেন, “একটি স্বরের মাধ্যমে আমি জানাতে চাই যে তারা গোপনে তাকে নিয়ে গিয়েছিল, আমি তা বিশ্বকে জানাব।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি নিজের দৃঢ়সংকল্প প্রকাশ করেন।
মালয়েশিয়ার দুইটি স্বাধীন তদন্তের ফলাফল দেখায় যে পুলিশ রে.কোহকে ইসলাম ধর্মের প্রধানধারার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে আদালত বিশেষ শাখা পুলিশের কাজকে অবৈধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অধিকন্তু, উচ্চ আদালতের রায়ের পর সরকারকে রে.কোহের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের শাস্তি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে রায়ের কার্যকরী হওয়ার জন্য সরকারকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই রায়ের পরবর্তী পর্যায়ে, রে.কোহের পরিবার এবং মানবাধিকার সমর্থকরা প্রত্যাশা করছেন যে সরকার দ্রুত তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে, রে.কোহের পরিবার সম্ভবত রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ ব্যবহার করতে পারে, যা মালয়েশিয়ার আইনি পদ্ধতিতে স্বাভাবিক।
মালয়েশিয়ার মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই রায়কে দেশের জোরপূর্বক অদৃশ্যতা মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তারা উল্লেখ করেন যে এই রায় ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার প্রতিরোধে একটি সতর্কতা হিসেবে কাজ করবে।
সুসান্না লিউ ভবিষ্যতে রে.কোহের নিখোঁজ হওয়ার সত্যিকারের কারণ উন্মোচনের জন্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য কাজ চালিয়ে যাবেন। তিনি উল্লেখ করেন যে তার সংগ্রাম শেষ নয়, এবং তিনি আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার অর্জনের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
মালয়েশিয়ার উচ্চ আদালতের এই রায় দেশের প্রথম জোরপূর্বক অদৃশ্যতা মামলায় একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা ভবিষ্যতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা বাড়াতে সহায়তা করবে।



