কোভিড‑১৯ টিকা সম্পর্কে সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফলগুলো আবারও দেখাচ্ছে যে, টিকাদান গুরুতর রোগ, দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ এবং মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশের বড় আকারের গবেষণায় এই ফলাফলগুলো সমর্থিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৃহৎ কোহোর্ট গবেষণায় ১.৫ মিলিয়ন ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত ব্যক্তির ডেটা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফল থেকে দেখা যায়, সম্পূর্ণ টিকাকরণ করা ব্যক্তিদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮০% কমে। একই সঙ্গে, টিকা না নেওয়া রোগীদের তুলনায় রোগের তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণায় দীর্ঘস্থায়ী কোভিড, অর্থাৎ লং কোভিডের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দুই ডোজ টিকা গ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে লং কোভিডের সম্ভাবনা প্রায় ৭০% কম। বিশেষ করে, ৩৫ বছর থেকে ৬০ বছর বয়সের গ্রুপে এই হ্রাস সবচেয়ে স্পষ্ট।
একটি আন্তর্জাতিক মেটা-অ্যানালাইসিসে ৩০টি র্যান্ডমাইজড ক্লিনিকাল ট্রায়ালের ডেটা সংকলন করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, টিকা গ্রহণকারী রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৯০% কমে। এই ফলাফলটি বিভিন্ন ভ্যাকসিনের প্রকারভেদে সামান্য পার্থক্য দেখলেও সামগ্রিকভাবে উচ্চ সুরক্ষা প্রদান করে।
টিকা কীভাবে সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে, তা নিয়ে একটি গবেষণায় ভাইরাসের লোডের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য হ্রাস পাওয়া গেছে। টিকা গ্রহণের ১৪ দিন পর থেকে সংক্রমিত ব্যক্তিরা ভাইরাসকে কম পরিমাণে ছড়িয়ে দেয়, ফলে সম্প্রদায়ে রোগের বিস্তার ধীর হয়।
নতুন ভ্যারিয়েন্ট, বিশেষ করে ওমিক্রন সাবলাইনগুলোর বিরুদ্ধে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, যদিও কিছু হ্রাস পেয়েছে, তবু টিকা গুরুতর রোগ ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে কার্যকর রয়ে গেছে। বুস্টার ডোজ গ্রহণের মাধ্যমে এই সুরক্ষা আরও বাড়ানো সম্ভব।
বুস্টার শটের প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণায় দেখা যায়, মূল সিরিজের দুই মাস পর বুস্টার নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অ্যান্টিবডি স্তর প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে, হালকা বা মাঝারি লক্ষণযুক্ত সংক্রমণের সম্ভাবনা কমে এবং রোগের তীব্রতা হ্রাস পায়।
সুরক্ষার দিক থেকে টিকা গ্রহণের নিরাপত্তা প্রোফাইলও ধারাবাহিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে। বড় আকারের পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার ১ শতাংশের কম দেখা গেছে, এবং অধিকাংশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া স্বল্পস্থায়ী ও হালকা রকমের।
স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উপর টিকার ইতিবাচক প্রভাবও স্পষ্ট। টিকা গ্রহণের ফলে হাসপাতালে ভর্তি ও আইসিইউ ব্যবহারের চাপ কমে, যা অন্যান্য জরুরি রোগের চিকিৎসার জন্য সম্পদ মুক্ত করে। ফলে, সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা মান উন্নত হয়।
বিভিন্ন গবেষণার সমন্বয়ে দেখা যায়, টিকা শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষা নয়, পুরো সমাজের স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। টিকাদান হার বাড়িয়ে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারেও সহায়তা করে।
এইসব ফলাফলকে বিবেচনা করে, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ টিকা গ্রহণ এবং বুস্টার শট নেওয়ার গুরুত্ব পুনরায় জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকির গোষ্ঠী—বয়স্ক, দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত এবং স্বাস্থ্যকর্মী—কে সম্পূর্ণ টিকাকরণ সম্পন্ন করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
আপনার এবং আপনার পরিবারের স্বাস্থ্যের জন্য টিকা গ্রহণের পরিকল্পনা কী? বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে, টিকা এবং বুস্টার শটের সময়সূচি মেনে চলা নিরাপদ ও কার্যকর উপায় হিসেবে সুপারিশ করা হচ্ছে।



