ঢাকার গাজীপুরের মৌচাক জাতীয় স্কাউট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাঠে শুক্রবার প্রথম আলো বন্ধুসভা জাতীয় বন্ধু সমাবেশ‑২০২৫‑এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল মূকাভিনয়, যেখানে শহীদ শারিফ ওসমান হাদির শেষ মুহূর্তকে পুনর্নির্মাণ করা হয়। হাদি, যিনি জুলাই ২০২৪‑এর অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছিলেন, ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন এবং ১৮ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
মঞ্চে তানভীর হাসান ওসমান হাদির চরিত্রে অভিনয় করেন। রিকশা চড়ে নির্বাচনী সফর শুরু করতে যাওয়া হাদি, পেছন থেকে আসা একটি মোটরসাইকেল চালকের গুলির শিকার হন। গুলিবিদ্ধ হাদি দ্রুত সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়, তবে চিকিৎসা সত্ত্বেও ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু ঘটে। মূকাভিনয়ে হাদির নির্বাচনী সফর, গণসংযোগ, গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তার দৃঢ় অবস্থানকে তুলে ধরা হয়।
অন্যান্য চরিত্রে সাকিব হোসেন, শারমিন আরা তিশা, মুশফিকুর রহমান, তাসনিম খান, মেঘা খেতান ও ইয়াছিন চৌধুরী অংশ নেন। কবি নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সঙ্গে নৃত্যাভিনয় করেন হোসাইন ইসলাম, যা মঞ্চে অতিরিক্ত আবেগের ছোঁয়া যোগায়। মূকাভিনয়ের শেষে প্রথম আলো বন্ধুসভার জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টি, যিনি ২০২৬‑২৭ কমিটির সদস্য, সমাবেশের উদ্দেশ্য ও দাবি তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, শহীদ শারিফ ওসমান হাদির স্মরণে এই উপস্থাপনা আয়োজন করা হয়েছে এবং তার হত্যার ন্যায়বিচার চাওয়া হচ্ছে।
শারিফ ওসমান হাদি, যিনি আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা‑৮ আসনে প্রার্থী হতে প্রচারে নেমেছিলেন, ১২ ডিসেম্বর গুলিবিদ্ধ হন। গুলির দায়ী সন্দেহভাজনরা মোটরসাইকেল চালিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলেন এবং হাদির পকেটে টাকা গুঁইয়ে গুলি চালিয়েছিলেন বলে জানা যায়। গুলিবিদ্ধ হাদি তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে ভর্তি হন, পরে সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। তবে তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে এবং ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়।
মৃত্যুর পর ২০ ডিসেম্বর ঢাকায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণে জানাজার পর হাদি শহীদ হিসেবে সমাহিত হন। সমাহিতের সময় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে উপস্থিতদের মধ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যারা হাদির স্বেচ্ছাসেবী কাজ ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তার অবদানের প্রশংসা করেন।
হাদির হত্যার পর পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে। ঘটনাস্থল থেকে গুলির ক্যালিবার, গুলি ও মোটরসাইকেল সম্পর্কিত প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। সন্দেহভাজনদের সনাক্তকরণের জন্য ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং সিআইডি ক্যামেরা রেকর্ডের মাধ্যমে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে তদন্তের অগ্রগতি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং মামলাটি দ্রুত আদালতে উপস্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রথম আলো বন্ধুসভা মূকাভিনয়ের মাধ্যমে হাদির জীবন ও মৃত্যুকে স্মরণ করার পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও আধিপত্যবাদী হুমকির বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। সমাবেশের অংশগ্রহণকারীরা নিরাপত্তা ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ, রাজনৈতিক হিংসা রোধ এবং হাদির মতো শহীদদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
হাদির হত্যার তদন্তে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি ইতিমধ্যে মামলাটি ফৌজদারি শাখায় দাখিল করেছে এবং আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভবিষ্যতে মামলার শুনানিতে সন্দেহভাজনদের উপস্থিতি, গুলির উৎস এবং গুলিবিদ্ধের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্রের বিশদ বিবরণ উপস্থাপন করা হবে।
এই ঘটনায় দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে, এটাই প্রথম আলো বন্ধুসভার মূল দাবি। মূকাভিনয়ের মাধ্যমে হাদির আত্মত্যাগের স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তার আদর্শকে রক্ষা করার জন্য সামাজিক সংহতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।



