ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুক্রবার দিল্লিতে একটি সংবাদসভার মাধ্যমে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চলমান হিংসা নিয়ে ভারতের গভীর উদ্বেগ রয়েছে। তিনি বিশেষভাবে ময়মনসিংহে সম্প্রতি ঘটিত হিন্দু যুবক দিপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে, দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় আনা দাবি করেছেন।
বক্তা উল্লেখ করেছেন, স্বতন্ত্র তথ্যসূত্রগুলো অন্তর্বর্তী সরকারকালের সময় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রায় দুই হাজার নয়শোটি সহিংস ঘটনার রেকর্ড পেয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে হত্যা, অগ্নিসংযোগ এবং জমি দখলের মতো অপরাধ, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা সংকটকে তীব্রতর করেছে।
রণধীর জয়সওয়াল জোর দিয়ে বলেছেন, এই ধরনের ঘটনা কেবলমাত্র সংবাদমাধ্যমের অতিরঞ্জন হিসেবে উপেক্ষা করা বা রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবে খণ্ডন করা সম্ভব নয়। তিনি উল্লেখ করেন, সংখ্যালঘুদের প্রতি এই ধারাবাহিক হিংসা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের লঙ্ঘন এবং তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে, শেখ হাসিনার সরকার থেকে সরে এসে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকার এবং দেশের কিছু গণমাধ্যম রণধীর জয়সওয়ালের মন্তব্যকে অতিরঞ্জন বলে সমালোচনা করেছে এবং এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যযুক্ত প্রচারণা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ডিসেম্বর ১৮ রাতে ময়মনসিংহে ধর্ম অবমাননা অভিযোগে হিন্দু যুবক দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং তার দেহ পোড়িয়ে ফেলা হয়। এই ঘটনায় দাসের পরিবার ও স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ পায়। ভারতের সরকার তৎক্ষণাৎ দাসের নৃশংস হত্যার নিন্দা জানিয়ে, সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের কঠোর শাস্তি ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার দাবি তুলে ধরেছে।
দিপু দাসের হত্যার পর, ভারতের বিভিন্ন হিন্দু জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশি মিশনগুলোর সামনে প্রতিবাদসূচক র্যালি চালায়। ২০ ডিসেম্বর রাতে দিল্লির কূটনৈতিক এলাকায় বাংলাদেশ হাই কমিশন ও হাই কমিশনারের বাসার সামনে বিশাল সমাবেশ হয়, যেখানে হাই কমিশনারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠে।
প্রদর্শনের অংশ হিসেবে শিলিগুড়িতে অবস্থিত বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারেও হিন্দু জাতীয় সংগঠনের নেতাদের নেতৃত্বে ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। এই প্রতিবাদগুলো দিপু দাসের হত্যার নিন্দা জানাতে এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান হিসেবে পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে রণধীর জয়সওয়াল উল্লেখ করেন, কিছু বাংলাদেশি গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, ২০-২৫ জন যুবক নতুন দিল্লিতে হাই কমিশনের সামনে একত্রিত হয়ে দিপু দাসের নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়েছেন এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার দাবি পুনরায় জোর দিয়েছেন।
ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, সংখ্যালঘুদের ওপর হিংসা কোনো রাজনৈতিক সংঘাতের অংশ নয়, বরং মানবাধিকার লঙ্ঘন। রণধীর জয়সওয়াল পুনরায় জোর দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উভয় দেশের দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বের ভিত্তি এবং এই বিষয়টি সমাধানে উভয় পক্ষের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।
দুই দেশের মধ্যে বর্তমান উত্তেজনা কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জলসম্পদ সংক্রান্ত আলোচনায় এই বিষয়টি অতিরিক্ত জটিলতা যোগ করতে পারে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নীতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
ভবিষ্যতে, উভয় দেশের কূটনৈতিক মঞ্চে এই বিষয়টি আলোচনার অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে বলে প্রত্যাশা করা যায়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য আইনি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অপরাধীদের দ্রুত বিচার করা এবং মিডিয়ার সঠিক তথ্য প্রচারকে উৎসাহিত করা এই প্রক্রিয়ার মূল দিক হবে।
সারসংক্ষেপে, ভারতীয় সরকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশে ঘটমান সহিংসতা সম্পর্কে স্পষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের আইনি দায়িত্ব আরোপের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে, দুই দেশের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেও কূটনৈতিক সংলাপ বজায় রেখে সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উভয় পক্ষই স্বীকার করেছে।



