চট্টগ্রাম জল সরবরাহ ও সেচ সংস্থা (ওয়াসা) থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে, কম্পিউটার প্রোগ্রামার লুৎফি জাহান এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন প্রতিনিধি, আগামী সোমবার ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। তাদের উদ্দেশ্য হল ডিজিটাল মিটার সরবরাহ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত ও সফটওয়্যার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা, যা ১৫ দিনের জন্য পরিকল্পিত।
সরকারের ৬ এপ্রিল জারি করা নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ঠিকাদার বা সরবরাহকারীর অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ করা যাবে না। তবুও ওয়াসা এই নির্দেশনা উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রে সফর পরিকল্পনা করেছে, যা জনমত ও মিডিয়ায় প্রশ্ন তুলেছে।
ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ারা বেগম সফরের অনুমোদন নিশ্চিত করে জানান যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের প্রক্রিয়া আগে থেকেই সম্পন্ন হয়েছে এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই সফরের কোনো খরচ সরকার বা ওয়াসা বহন করবে না; পুরো ব্যয় ডেলিভারি কোম্পানি নিজেই বহন করবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকসুদ জাহেদীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের মতে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে ৩,০০০টি ডিজিটাল মিটার ক্রয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল ছয় মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ স্থাপন। সময়সীমা পূরণ না হওয়ায় কাজটি বিলম্বিত হয়ে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শেষ হয়।
মিটার স্থাপনের মোট খরচ ৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘উইংস ইনভেস্টমেন্ট এলএলসি’ চিহ্নিত হয়েছে। এই প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে মাহবুবুল আলম মিটার স্থাপনের সরাসরি কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তবে ২০২২ সালের জুলাই মাসে তিনি অন্য একটি প্রকল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন, যেখানে শিল্পকারখানা পরিদর্শন এবং পানি জীবাণুমুক্তকরণ প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়েছিল।
এই সফরের মূল লক্ষ্য হল ডিজিটাল মিটার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত সর্বশেষ সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার জ্ঞান অর্জন করা, যা ভবিষ্যতে ওয়াসার মিটার ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে কর্মকর্তারা শিখিত প্রযুক্তি স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োগ করে মিটার রিডিং স্বয়ংক্রিয়করণ, ডেটা বিশ্লেষণ এবং গ্রাহক সেবার মানোন্নয়ন করতে পারবেন।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ডিজিটাল মিটার প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি গ্রহণের ফলে ওয়াসার সরবরাহ চেইন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচে দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিদেশি প্রশিক্ষণের জন্য সরবরাহকারীর ব্যয় বহন করা হলে, প্রকল্পের মোট ব্যয় কাঠামোতে পরিবর্তন আসতে পারে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের নির্দেশনা ওয়াসার মতো পাবলিক ইউটিলিটি সংস্থার জন্য কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলে, বিদেশি সফরের জন্য তহবিল সংগ্রহের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে, ওয়াসা যদি সরবরাহকারীর ব্যয় বহন করে থাকে, তবে তা আর্থিক স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উত্থাপন করে।
ডিজিটাল মিটার স্থাপনের ফলে গ্রাহকদের বিলিং সঠিকতা বৃদ্ধি পাবে, রিয়েল-টাইম ডেটা সংগ্রহের মাধ্যমে লিকেজ সনাক্তকরণ সহজ হবে এবং পানির অপচয় কমবে বলে আশা করা যায়। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ওয়াসার সেবা মানোন্নয়ন ও গ্রাহক সন্তুষ্টি বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে, যা শেষ পর্যন্ত সংস্থার আয় বৃদ্ধি এবং সরকারি তহবিলের উপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
তবে, প্রশিক্ষণ শেষে প্রযুক্তি স্থানীয়ভাবে রূপান্তর ও বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ অবকাঠামো ও মানবসম্পদ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশিক্ষণকৃত কর্মকর্তাদের দক্ষতা স্থানীয় টিমে ছড়িয়ে দিতে অতিরিক্ত কর্মশালা ও সাপোর্ট সিস্টেমের প্রয়োজন হতে পারে, যা অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রে সফরটি ওয়াসার ডিজিটাল মিটার প্রকল্পের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, তবে সরকারী নির্দেশনা লঙ্ঘনের সম্ভাবনা এবং আর্থিক স্বচ্ছতার দিক থেকে সতর্কতা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রশিক্ষণ ও তহবিল ব্যবস্থাপনা কীভাবে গঠন করা হবে, তা সংস্থার আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য মূল চাবিকাঠি হবে।



