ইসরায়েলি বায়ু বাহিনীর দুটি পৃথক আক্রমণে লেবাননের উত্তরে ও দক্ষিণে মোট তিনজনের প্রাণ ত্যাগ হয়েছে। প্রথম আক্রমণটি ২৫ ডিসেম্বর, উত্তর-পূর্বের হারমেল জেলার হাউশ আল‑সাইয়্যেদ আলি এলাকায় একটি গাড়ি লক্ষ্য করে চালানো হয়, যেখানে দুইজন নাগরিক নিহত হয়। একই দিনে লেবাননের দক্ষিণে মাজদাল সেলম অঞ্চলে আরেকটি বিমান হামলা সংঘটিত হয়, যার ফলে আরেকজনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই হামলাগুলি লেবাননের সিরিয়া সীমান্তের নিকটবর্তী এলাকায় ঘটেছে, যা ইসরায়েলি পক্ষ থেকে কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সিরিয়া সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত হাউশ আল‑সাইয়্যেদ আলি এলাকাকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পূর্বে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
নভেম্বর ২০২৪-এ উভয় পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও, লেবাননের আকাশ ও স্থলপথে ইসরায়েলি সামরিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি বিবৃতিতে জানায় যে, তারা ইরানের বিপ্লবী গার্ডের কুদস ফোর্সের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হুসেইন মাহমুদ মারশাদ আল‑জাওহারিকে লক্ষ্যবস্তু করে হত্যা করেছে।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, আল‑জাওহারি লেবানন ও সিরিয়া থেকে ইসরায়েলের ভূখণ্ডে বড় আকারের হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে, মাজদাল সেলমের আক্রমণে হিজবুল্লাহর একজন সক্রিয় সদস্যকে হত্যা করার দাবি করা হয়েছে।
ইসরায়েল বর্তমানে লেবাননের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সেনা মোতায়েন করেছে, যা কৌশলগত দখল ও সীমান্ত রক্ষার উদ্দেশ্য বহন করে। এই পদক্ষেপটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তাবলীর সঙ্গে বিরোধপূর্ণ হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
লেবানন সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মুখে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। লেবাননের সেনাবাহিনী জানিয়েছে যে, লিতানি নদীর দক্ষিণে, ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ কার্যক্রম বছরের শেষ নাগাদ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে ইসরায়েলি পক্ষের অভিযোগে হিজবুল্লাহ গোপনে পুনরায় ভারী অস্ত্র সংগ্রহ করছে এবং সীমান্তে তাদের সক্রিয়তা বাড়িয়ে তুলেছে। হিজবুল্লাহ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে, সকল অস্ত্র ত্যাগের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলেছে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, লেবাননে চলমান এই সামরিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জটিলতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এই পরিস্থিতিতে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে।
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চলমান সংঘাতের ফলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি আলোচনা আহ্বান করা হয়েছে। কিছু দেশ এই আলোচনায় লেবাননের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা ও হিজবুল্লাহর অস্ত্রধারিতা সীমিত করার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসে সামরিক সংঘাতে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, যদিও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এখনও প্রকাশিত হয়নি। সরকারী সূত্রে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে কোনো বড় আকারের সামরিক অভিযান এড়াতে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ইসরায়েলি আক্রমণ ও লেবাননের প্রতিক্রিয়া উভয়ই মধ্যপ্রাচ্যের জটিল গোষ্ঠী গঠনকে প্রভাবিত করবে। বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি হিজবুল্লাহ তার অস্ত্রধারিতা বজায় রাখে, তবে ইসরায়েলি শক্তি ও লেবাননের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে টানাপোড়েন বাড়তে পারে।
পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর থাকবে লেবাননের দক্ষিণে নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এবং ইসরায়েলি সেনা মোতায়েনের সময়সীমা। উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তা আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, লেবাননের সরকার ও হিজবুল্লাহ উভয়ই আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাদের অবস্থান রক্ষা করার চেষ্টা করছে, একই সঙ্গে ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে কী ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতা হবে, তা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর উপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।



