শুক্রবার ভোরে চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে ঘন কুয়াশার মধ্যে দুইটি লঞ্চের ধাক্কা ঘটায় কমপক্ষে চারজনের মৃত্যু এবং বহু আহতের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা গন্তব্যে চলছিল MV জাকির সম্রাট‑৩, যা ভোলা জেলার ঘোশেরহাট থেকে রওনা হয়েছিল, এবং বারিশাল গন্তব্যে চলছিল MV অ্যাডভেঞ্চার‑৯। দু’টি জাহাজের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে এক নারী ও তিন পুরুষের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
লঞ্চগুলো রাত ২টার কাছাকাছি হাইমচার এলাকায় পারাপার করছিল, যখন কুয়াশা দৃষ্টিসীমা সীমিত করে দেয়। ঘন কুয়াশার কারণে জাকির সম্রাট‑৩ সঠিকভাবে পথ নির্ধারণ করতে পারেনি, ফলে বারিশাল‑মুখী অ্যাডভেঞ্চার‑৯ তার সঙ্গে ধাক্কা মারতে বাধ্য হয়। এই সংঘর্ষটি হাইমচার উপজেলা ও হারিনা এলাকার মধ্যে ঘটেছে, যেখানে নদীর প্রবাহ ও কুয়াশা নেভিগেশনকে কঠিন করে তুলেছিল।
দ্রুতগতি বজায় রাখার সময় দু’টি লঞ্চের মাঝখানে সংঘর্ষের ফলে উভয় জাহাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং যাত্রীদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত রিভার পুলিশ দল দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আহতদের উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালগুলোতে নিয়ে যায়। আহতদের মধ্যে বয়সের বৈচিত্র্য রয়েছে, তবে অধিকাংশই হালকা থেকে মাঝারি আঘাতের শিকার হয়েছে।
ঢাকা জেলা রিভার পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট আবদুল্লাহ আল মামুন ঘটনাটির প্রাথমিক তথ্য জানিয়ে বলেন, মৃতদের মধ্যে এক নারী ও তিন পুরুষের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহতদের সংখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ না করলেও, রিভার পুলিশ ও স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান যে বেশ কয়েকজনকে জরুরি সেবা প্রদান করা হয়েছে।
অভিযুক্ত লঞ্চের ক্যাপ্টেন ও সহকারী কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং রিভার পুলিশ তাদের বিবৃতি নেয়ার পর তদন্ত চালিয়ে যাবে। রিভার পুলিশ জানিয়েছে, কুয়াশা ও অযথা গতি এই ধরনের দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হতে পারে এবং ভবিষ্যতে একই রকম ঘটনা রোধে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
প্রাথমিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে, উভয় জাহাজই নির্ধারিত রুটে চলছিল, তবে কুয়াশা সঠিকভাবে বিবেচনা না করে গতি বজায় রাখার ফলে সংঘর্ষ ঘটেছে। রিভার পুলিশ দল ঘটনাস্থলে রেকর্ডেড ডেটা, রাডার ও নৌকা চালকদের বিবৃতি সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করবে। এছাড়া, রিভার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে কুয়াশা পরিস্থিতিতে নৌচালকদের জন্য বিশেষ নির্দেশিকা জারি করার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুর্ঘটনা ঘটার পর রিভার পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত উদ্ধার কাজ শুরু করে, এবং আহতদের জন্য জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করে। আহতদের মধ্যে যারা গুরুতর আঘাত পেয়েছেন, তাদেরকে চাঁদপুরের সরকারি হাসপাতাল ও নিকটস্থ বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে। রোগীর পরিবারকে অবহিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
এই ঘটনার পর রিভার পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট নৌচালনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি সমন্বিত তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি দুর্ঘটনার মূল কারণ নির্ণয়, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে নৌযাত্রা নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা প্রণয়ন করবে। তদন্তের ফলাফল আদালতে উপস্থাপন করা হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মেঘনা নদীর এই দু’টি লঞ্চের ধাক্কা নৌযাত্রা নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, বিশেষ করে ঘন কুয়াশা ও অল্প দৃশ্যমানতার সময়ে নেভিগেশন নিয়মের প্রয়োগে। স্থানীয় নৌচালকদের জন্য অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ও কুয়াশা সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি বাড়ছে। সরকারী ও বেসরকারি সংস্থা এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে নৌযাত্রা নিয়মাবলী কঠোর করার প্রস্তাব দিচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, চাঁদপুরে মেঘনা নদীর এই ট্র্যাজেডি নৌযাত্রা নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা ও কুয়াশা পরিস্থিতিতে সঠিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। রিভার পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত চলমান থাকায়, ভবিষ্যতে নৌযাত্রা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ নীতি ও নিয়মাবলী প্রণয়ন করা হবে।



