শিলিগুড়ি, উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রধান পর্যটন ও ব্যবসায়িক গেটওয়ে, তার বৃহত্তর হোটেল ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি (বিএসিএ) বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য কোনো হোটেল রুম বরাদ্দ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই সিদ্ধান্তটি ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত একটি টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সমিতি উল্লেখ করেছে যে, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভারতবিরোধী মনোভাবের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিএসিএর যৌথ সচিব উজ্জ্বল ঘোষের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রাথমিকভাবে গৃহীত হয়েছিল, তবে মানবিক বিবেচনায় শিক্ষার্থী ও চিকিৎসা সেবার জন্য আসা বাংলাদেশিদের জন্য কিছুটা শিথিলতা রাখা হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে এখন থেকে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হবে, যা সমিতির সকল সদস্য হোটেলকে বাধ্য করবে।
সমিতির অধীনে থাকা প্রায় ১৮০টি হোটেল এই নির্দেশনা মেনে চলবে বলে জানানো হয়েছে। তদুপরি, শিলিগুড়ির স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, সমিতির বাইরে প্রায় ৫০টি হোটেলও ইতিমধ্যে বাংলাদেশি অতিথিদের কক্ষ ভাড়া দিচ্ছে না। ফলে শহরের হোটেল বাজারে বাংলাদেশি পর্যটক ও রোগীর জন্য বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিলিগুড়ি পূর্বোত্তর ভ্রমণকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট, যেখানে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি পর্যটক নেপাল ও ভুটানের পথে যাত্রা করে। একই সঙ্গে, শহরের উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে সেবা নিতে আসা রোগীরাও উল্লেখযোগ্য। এই গোষ্ঠীর ওপর হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে তাদের ভ্রমণ ও চিকিৎসা পরিকল্পনা ব্যাহত হয়েছে।
বিএসিএ কর্তৃক উল্লেখিত মূল কারণ হল বাংলাদেশে বাড়তে থাকা সহিংসতা এবং ভারতবিরোধী মনোভাবের প্রতিবাদ। সমিতি দাবি করে যে, এই রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদের ব্যবসায়িক পরিবেশকে অনিরাপদ করে তুলেছে এবং তাই তারা রক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এই নিষেধাজ্ঞা গ্রহণ করেছে। যদিও এই যুক্তি ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত, তবু এটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটন নীতির সঙ্গে সংঘর্ষের সম্ভাবনা তৈরি করে।
হোটেল শিল্পের জন্য এই সিদ্ধান্তের অর্থ হল সম্ভাব্য আয় হ্রাস। শিলিগুড়ি হোটেল ব্যবসা ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশি পর্যটক ও রোগীর থেকে উল্লেখযোগ্য আয় পেত। এখন এই গ্রাহক গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে, হোটেলগুলোকে বিকল্প বাজার অনুসন্ধান করতে হবে অথবা শূন্য কক্ষের কারণে আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করতে হবে। বিশেষ করে মাঝারি ও ছোট হোটেলগুলোতে এই প্রভাব তীব্র হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, বাংলাদেশি পর্যটকদের বিকল্প গন্তব্য হিসেবে নিকটবর্তী শহরগুলো, যেমন গয়না বা কুড়িগ্রাম, দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে পারে। তবে এই শহরগুলোতে পর্যাপ্ত হোটেল অবকাঠামো না থাকায় সেবা মানে হ্রাসের ঝুঁকি রয়েছে। ফলে শিলিগুড়ির হোটেল শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আইনি দিক থেকে, হোটেল ব্যবসায়ীরা গ্রাহক অধিকার সংক্রান্ত অভিযোগের মুখোমুখি হতে পারেন। বাংলাদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নীতি প্রয়োগের অভিযোগ উত্থাপিত হলে, স্থানীয় আদালতে মামলা দায়েরের সম্ভাবনা থাকে। এমন পরিস্থিতি ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষয় এবং অতিরিক্ত আইনি ব্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে, সমিতি যদি এই নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখে, তবে শিলিগুড়ির পর্যটন ও চিকিৎসা সেবা খাতের পুনরুদ্ধার দীর্ঘ সময় নিতে পারে। অন্যদিকে, যদি রাজনৈতিক পরিস্থিতি শিথিল হয় এবং দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত হয়, তবে হোটেল ব্যবসায়ীরা পুনরায় বাংলাদেশি গ্রাহকদের লক্ষ্য করে বাজার পুনর্গঠন করতে পারে। বর্তমান সময়ে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা এবং বিকল্প গ্রাহক সেগমেন্টে বিনিয়োগ করা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, শিলিগুড়ির বৃহত্তর হোটেল ব্যবসায়ী সমিতির বাংলাদেশি অতিথিদের জন্য কক্ষ বরাদ্দ বন্ধের সিদ্ধান্ত স্থানীয় হোটেল শিল্পে তাত্ক্ষণিক আয় হ্রাস, গ্রাহক সেবা ব্যাঘাত এবং সম্ভাব্য আইনি ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। এই পদক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নির্ভর করবে রাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন এবং হোটেল ব্যবসায়ীদের বাজার অভিযোজনের সক্ষমতার ওপর।



