রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, এই বছর সাপের কামড়ের কারণে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ১,৪৯০-এ পৌঁছেছে, যার মধ্যে ৫১ জনের মৃত্যু ঘটেছে। গত বছরের তুলনায় রোগীর সংখ্যা ১১৭ বেশি এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১১ বেশি। এই বৃদ্ধি স্থানীয় স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ।
চাঁদপুরের চারঘাট বাজারে সম্প্রতি এক কৃষক হেফজুল হক সাপের কামড়ের শিকার হন। তিনি রাসেলস ভাইপারের কামড়ের ফলে তীব্র ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালে পৌঁছান। সাপটি তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হয় এবং হেফজুল হককে জরুরি চিকিৎসা প্রদান করা হয়।
হেফজুল হককে তিন দিনের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়। যথাযথ অ্যান্টিভেনম ও সমর্থনমূলক থেরাপি শেষে তিনি সুস্থ হয়ে হাসপাতালে থেকে ছাড়পত্র পান। তার দ্রুত সেরে ওঠা স্থানীয় জনগণের মধ্যে সাপের কামড়ের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেকর্ডে দেখা যায়, এই বছর সাপের কামড়ের রোগীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মোট ১,৪৯০ রোগীর মধ্যে ৫১ জনের মৃত্যু ঘটেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১১৭ রোগীর বৃদ্ধি এবং ১১ জনের বেশি মৃত্যুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সাপের প্রজাতি হিসেবে প্রধানত রাসেলস ভাইপারকে দায়ী করা হচ্ছে। বোরহান বিশ্বাস, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টারের প্রশিক্ষক, উল্লেখ করেন যে পরিবেশের পরিবর্তনের ফলে এই সাপের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে শীতল বাতাস থেকে উষ্ণতা পাওয়ার জন্য সাপগুলো মানুষের শোয়ানোর ঘরে প্রবেশ করে, ফলে কামড়ের ঘটনা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞের মতে, রাসেলস ভাইপার সাধারণত নদীর তীরবর্তী ধানক্ষেত ও বন্যারাপন্ন মাঠে বেশি দেখা যায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার অস্থিরতা সাপকে মানব বসতিগুলোর নিকটে নিয়ে এসেছে। এই পরিবেশগত চাপ সাপের প্রজনন চক্রকে প্রভাবিত করে, ফলে স্ত্রী সাপের বাচ্চার অনুপাত বৃদ্ধি পায়।
বোরহান বিশ্বাস ২০১৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত তার গবেষণায় ৮৮টি রাসেলস ভাইপারের বাচ্চা সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ৮২টি নারী লিঙ্গের ছিল, যা প্রজাতির লিঙ্গ অনুপাতের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নির্দেশ করে। গবেষণায় দেখা যায়, নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার শর্তে সাপের স্ত্রী বাচ্চা বেশি জন্মায়।
রাজশাহীর অন্যান্য অঞ্চলেও একই ধরণের লিঙ্গ অনুপাতের সমতা দেখা গেছে, তবে চরম আবহাওয়ার প্রভাবের কারণে সামগ্রিকভাবে সাপের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিক পরিবর্তন সাপের বাসস্থানকে প্রভাবিত করেছে। এই পরিবর্তনগুলো সাপের জনসংখ্যা বাড়িয়ে তুলেছে এবং মানুষের সঙ্গে সংঘর্ষের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, এই বছর রাজশাহীতে গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে সাপের প্রাকৃতিক শিকারের স্থান হ্রাস পেয়েছে, ফলে সাপগুলো মানব বসতিগুলোর নিকটে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এই পরিস্থিতি সাপের কামড়ের ঘটনার সংখ্যা বাড়িয়ে তুলেছে।
সাপের কামড় প্রতিরোধে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সম্প্রতি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মীরা গ্রাম ও শহরের বাসিন্দাদের সাপের উপস্থিতি সম্পর্কে সতর্কতা প্রদান করছেন এবং জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্রে অ্যান্টিভেনমের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করছেন। এছাড়া, সাপের আশ্রয়স্থল হ্রাসের জন্য পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে। বিশেষ করে কৃষক ও নার্সারি কর্মীদের সাপের কামড়ের প্রাথমিক লক্ষণ ও দ্রুত চিকিৎসার গুরুত্ব সম্পর্কে জানানো হচ্ছে। সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে সময়মত অ্যান্টিভেনম গ্রহণই বেঁচে থাকার মূল চাবিকাঠি, তাই স্থানীয় জনগণকে জরুরি অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালের সাহায্য নিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
সাপের কামড়ের ঘটনা বাড়ার পেছনে পরিবেশগত পরিবর্তন ও মানব বসতিগুলোর নিকটে সাপের প্রবেশের কারণ স্পষ্ট। আপনি কি আপনার বাড়ি ও আশেপাশের এলাকায় সাপের সম্ভাব্য উপস্থিতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানেন? সঠিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।



