যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইটারে জানিয়েছেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী নর্থ-ওয়েস্টার্ন নাইজেরিয়ায় ইস্লামিক স্টেট (আইএস) গোষ্ঠীর ওপর “শক্তিশালী এবং প্রাণঘাতী” আক্রমণ চালিয়েছে। তিনি আইএসকে “সন্ত্রাসী নোংরা” বলে বর্ণনা করে, তাদের প্রধানত নিরপরাধ খ্রিস্টান জনগণকে লক্ষ্য করে নির্মমভাবে হত্যা করার অভিযোগ তুলেছেন। ট্রাম্পের পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী একাধিক “সুন্দরভাবে সম্পন্ন” আক্রমণ সম্পন্ন করেছে, তবে লক্ষ্যবস্তু, সময় বা ক্ষতির সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এই আক্রমণটি নভেম্বর মাসে ট্রাম্পের আদেশের পরপরই বাস্তবায়িত হয়েছে, যখন তিনি নাইজেরিয়ায় ইসলামিক উগ্রবাদের মোকাবিলায় সামরিক প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেন। সেই সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা ও গোয়েন্দা সহায়তা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমে আইএসের উপস্থিতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ছে, বিশেষ করে ধর্মীয় সংঘর্ষের ফলে খ্রিস্টান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা তীব্রতর হয়েছে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, আইএস গোষ্ঠী নিয়মিতভাবে গ্রামাঞ্চলে আক্রমণ চালিয়ে বসতিবাসীদের প্রাণহানি ও সম্পত্তি ধ্বংস করে আসছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপকে প্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি মুখপাত্রের মতে, এই আক্রমণটি আইএসের ক্ষমতা হ্রাস এবং নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। তিনি উল্লেখ করেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে উন্নত গোয়েন্দা প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে এবং আক্রমণের সময় নাগরিক ক্ষতি কমানোর জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। যদিও নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু প্রকাশ না করা হয়েছে, তবে এই ধরনের অপারেশন সাধারণত প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, অস্ত্র গুদাম এবং নেতৃত্বের কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত হয়।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, এই আক্রমণটি নাইজেরিয়ার সরকারকে আন্তর্জাতিক সমর্থন নিশ্চিত করতে এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সংকেত হিসেবে কাজ করবে। তারা আরও উল্লেখ করেন যে, নিকটবর্তী দেশগুলো, বিশেষ করে চাদ, নাইজার ও ক্যামেরুন, একই ধরনের সন্ত্রাসী হুমকির মুখে রয়েছে, ফলে এই ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রভাব সীমান্ত পার হয়ে বিস্তৃত হতে পারে।
নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলু তায়ি সানওয়ানও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, দেশটি আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সকল পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
ইউনাইটেড নেশনসের আফ্রিকান ইউনিটের একটি প্রতিনিধিও এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মন্তব্য করে, আইএসের মত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘমেয়াদী সমাধান শুধুমাত্র সামরিক হস্তক্ষেপে নয়, বরং স্থানীয় সম্প্রদায়ের উন্নয়ন, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্জনযোগ্য।
এই আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে, নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী আইএসের অবশিষ্ট কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং পুনরায় গঠন রোধে তীব্রতা বাড়িয়ে চলেছে। সরকার ইতিমধ্যে কয়েকটি অতিরিক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপন করেছে এবং স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশ্বের অন্যান্য প্রধান শক্তি, যেমন যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স, এই ঘটনার প্রতি সংযত মন্তব্য করে, আফ্রিকায় সন্ত্রাসী হুমকির মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়েছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে আইএসের কার্যক্রম সীমিত করার একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবে একই সঙ্গে মানবিক প্রভাব ও নাগরিক সুরক্ষার প্রতি সতর্কতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সাম্প্রতিক আক্রমণ নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও আক্রমণের সুনির্দিষ্ট ফলাফল এখনো স্পষ্ট নয়, তবে এটি ইস্লামিক স্টেটের ক্ষমতা হ্রাস এবং অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণের সংকেত বহন করে। ভবিষ্যতে, এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপের পরিপূরক হিসেবে রাজনৈতিক সংলাপ, মানবিক সহায়তা এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সমন্বয় প্রয়োজন হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।



