ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর পুনর্নির্বাচনের বিরোধে গৃহীত প্রতিবাদে আটক হওয়া অন্তত ৬০ জনের মুক্তি হয়েছে, যা মানবাধিকার সংস্থা ‘কমিটি ফর দ্য ফ্রিডম অফ পলিটিক্যাল প্রিজনার্স’ (CFPP) জানিয়েছে। মুক্তির কাজটি ক্রিসমাসের আগের দিন, বৃহস্পতিবারের ভোরে শুরু হয়।
CFPP-র প্রধান আন্দ্রেইনা বাদুয়েল এই মুক্তিকে “৬০‑এর বেশি ভেনেজুয়েলীয়দের অবৈধ আটক শেষের সূচনা” বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, “যদিও তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়, আমরা তাদের পূর্ণ মুক্তি এবং সব রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তির জন্য কাজ চালিয়ে যাব।”
মাদুরো জুলাই ২০২৪ সালের নির্বাচনে তৃতীয় মেয়াদে পুনর্নির্বাচিত হন, তবে ফলাফলকে বিরোধী দলগুলো জালিয়াতি অভিযোগের ভিত্তিতে অস্বীকার করে। এই বিতর্কের পর দেশব্যাপী প্রতিবাদ শুরু হয়, যার ফলে নিরাপত্তা বাহিনী প্রায় ২,৪০০ জনকে গ্রেফতার করে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃত প্রায় ২,০০০ জনের মুক্তি ইতিমধ্যে হয়েছে, তবে এখনও ৯০২ জন রাজনৈতিক বন্দী কারাবন্দি রয়েছে, যা ‘ফোরো পেনাল’ নামের এনজিও পর্যবেক্ষণ করে।
মুক্ত হওয়া বন্দীদের বেশিরভাগই আরাগুয়া রাজ্যের টোকোরন কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছে, যা ক্যারাকাসের প্রায় ১৩৪ কিলোমিটার (৮৩ মাইল) দূরে অবস্থিত একটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সুবিধা। টোকোরন কারাগারের শর্তাবলী ও মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে সরকারি পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশিত হয়নি।
বাদুয়েল উল্লেখ করেন, “এক হাজারেরও বেশি পরিবার এখনও রাজনৈতিক বন্দীর কারাবাসের কারণে কষ্টে আছে।” তিনি নিজের পারিবারিক ইতিহাসের কথাও স্মরণ করে বলেন, তার পিতা রাউল ইসাইয়াস বাদুয়েল, যিনি একসময় চাভেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং রক্ষা মন্ত্রী ছিলেন, ২০২১ সালে কারাবাসে মৃত্যুবরণ করেন।
এই মুক্তি প্রক্রিয়া যদিও সীমিত, তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সরকারের দমন নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিরোধী দলগুলো দাবি করে যে, গ্রেফতার ও কারাবাসের সংখ্যা এখনও উচ্চমাত্রায় রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ভেনেজুয়েলার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশিত হয়নি যে, কী শর্তে বন্দীরা মুক্তি পেয়েছেন বা ভবিষ্যতে আরও মুক্তি হবে কিনা। তবে CFPP এবং অন্যান্য মানবাধিকার গোষ্ঠী দাবি করে যে, অবৈধভাবে আটক হওয়া সকলের পূর্ণ মুক্তি নিশ্চিত করা উচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, মাদুরোর তৃতীয় মেয়াদে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে, বিশেষ করে মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজরদারির ফলে। এই পরিস্থিতি সরকারকে অভ্যন্তরীণ বিরোধ কমাতে এবং রাজনৈতিক বন্দীদের অবস্থা উন্নত করতে বাধ্য করতে পারে।
অন্যদিকে, বিরোধী গোষ্ঠী ও মানবাধিকার কর্মীরা দাবি করে যে, এখনো ৯০২ জন রাজনৈতিক বন্দী কারাবাসে রয়েছে, এবং তাদের মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন ও চাপ বাড়ানো প্রয়োজন। তারা আরও জোর দিয়ে বলছে, টোকোরন কারাগারের মতো উচ্চ নিরাপত্তা কারাগারগুলোতে আটকদের শর্তাবলী আন্তর্জাতিক মানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক দৃশ্যপটের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত, তবে এই মুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে। যদি সরকার আরও মুক্তি দেয় এবং রাজনৈতিক বন্দীদের অবৈধ আটক শেষ করে, তবে তা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, যদি দমন নীতি অব্যাহত থাকে, তবে দেশীয় অশান্তি ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়তে পারে।
সারসংক্ষেপে, ক্রিসমাসের সময়ে ৬০ জনের বেশি রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তি ভেনেজুয়েলার মানবাধিকার পরিস্থিতিতে একটি অস্থায়ী স্বস্তি এনে দিয়েছে, তবে এখনও হাজারো পরিবার ও শতাধিক বন্দীর অবস্থা অনিশ্চিত রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল।



