ফ্রান্স, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা ও ফিলিপাইনের চারজন শীর্ষ রাজনীতিবিদ, দীর্ঘ নির্বাসনের পর দেশে ফিরে শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তাদের প্রত্যাবর্তন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক দিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই নেতারা কীভাবে নির্বাসনকে পুনরায় ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তা আজকের বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে।
ফ্রান্সের চার্লস দে গল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি শাসনের মুখে লন্ডনে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি “ফ্রি ফ্রেঞ্চ ফোর্সেস” গঠন করে ফ্রান্সের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম চালান। ১৯৪৪ সালে প্যারিস মুক্তি পেলে তিনি দেশভ্রমণ করে জনগণের সমর্থন অর্জন করেন এবং ১৯৫৮ সালে পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তার প্রত্যাবর্তন ফ্রান্সের পুনর্গঠন ও গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো, ১৯৮০-এর দশকে জিয়াউল হকের সামরিক শাসনের মুখে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত হন। নির্বাসনকালে তিনি পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতৃত্ব বজায় রাখেন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সক্রিয়ভাবে মতামত প্রকাশ করেন। ১৯৮৬ সালে দেশে ফিরে তিনি বিশাল জনসমাবেশে স্বাগত পান, ১৯৮৮ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করে প্রধানমন্ত্রী হন এবং ১৯৯৩-এ পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসেন। তার প্রত্যাবর্তন দেশের নারীর ক্ষমতায়ন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনরুজ্জীবনে প্রভাব ফেলেছে।
আর্জেন্টিনার হুয়ান পেরোন, ১৯৫৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং প্রায় আঠারো বছর বিদেশে কাটাতে বাধ্য হন। নির্বাসনকালে তিনি শ্রমিক ও দরিদ্র জনগণের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখেন, যা তার জনপ্রিয়তা বজায় রাখতে সহায়তা করে। ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে তিনি নির্বাচনে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে প্রেসিডেন্ট হন, যা আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক দৃশ্যপটে পুনরায় পপুলিস্ট প্রবাহের সূচনা করে।
ফিলিপাইনের কোরাজন অ্যাকুইনো, স্বামী বেনিনো অ্যাকুইনোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে ছিলেন। ১৯৮৩ সালে স্বামী হত্যার পর তিনি গণআন্দোলনের নেতৃত্ব নেন এবং ১৯৮৬ সালের পিপল পাওয়ার আন্দোলনের মাধ্যমে ফার্দিনান্দ মার্কোসের শাসন শেষ করতে সক্ষম হন। একই বছরে তিনি প্রেসিডেন্টের শপথ নেন, যা ফিলিপাইনের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মূলে দাঁড়ায়। তার শাসনকাল দমনমূলক শাসনের পর দেশের রাজনৈতিক সংস্কারের সূচনা করে।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এই নেতাদের প্রত্যাবর্তন কখনো কখনো বিদ্রোহী বা অস্থিরতাবাদী হিসেবে সমালোচিত হয়েছে। দে গলকে কিছু সময়ে ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে নতুন শক্তি হিসেবে দেখা হয়, আর ভুট্টোকে তার নারী নেতৃত্বের জন্য কিছু সংরক্ষণশীল গোষ্ঠী সমালোচনা করে। পেরোনের পপুলিস্ট নীতি শ্রমিকদের পক্ষে হলেও, তার শাসনকালে অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে বিতর্ক রয়ে যায়। কোরাজন অ্যাকুইনোর শাসনকালেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে। এই সমালোচনাগুলি ভবিষ্যতে তাদের উত্তরাধিকারকে জটিল করে তুলতে পারে।
নির্বাসন শেষ করার পর এই নেতাদের প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক দিক পরিবর্তনে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফ্রান্সে দে গলের উত্তরাধিকার ইউরোপীয় সংহতি ও সামরিক শক্তির পুনর্গঠনে অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাকিস্তানে ভুট্টোর পুনরায় ক্ষমতায় আসা নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে, তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তাকে জটিল নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। আর্জেন্টিনায় পেরোনের পুনরায় শাসন শ্রমিক আন্দোলনের শক্তি বাড়াবে, তবে অর্থনৈতিক সংস্কার ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। ফিলিপাইনে অ্যাকুইনোর শাসনকাল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবে, তবে দুর্নীতি ও সামাজিক বৈষম্য দূর করতে দীর্ঘমেয়াদী নীতি প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, নির্বাসন শেষ করে শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হওয়া এই চারজন নেতার গল্প, রাজনৈতিক ইতিহাসে একধরনের পুনর্জন্মের উদাহরণ। তাদের প্রত্যাবর্তন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন রাজনৈতিক গতিপথ তৈরি করবে, যা পরবর্তী বছরগুলিতে দেশের নীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকে প্রভাবিত করবে।



