ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে যে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) এর বাহ্যিক শাখার একজন কর্মীকে লেবাননের বিভিন্ন স্থানে চালানো ড্রোন আক্রমণে নিহত করা হয়েছে। একই দিনে হেরমেল জেলার হোশ আল-সায়েদ আলি রোডে একটি গাড়ি আঘাতপ্রাপ্ত হয়, যেখানে দুইজন লোক প্রাণ হারায়। ইসরায়েলি সূত্রে হুসেইন মাহমুদ মারশাদ আল-জাওহরি, যাকে আইআরজিসি’র কুদস ফোর্সের সদস্য বলে দাবি করা হয়েছে, অ্যানসারিয়াহ অঞ্চলে তার গাড়ি আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর মারা যায়।
ইসরায়েলি বাহিনীর মতে, আল-জাওহরি সিরিয়া ও লেবানন থেকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরান-নির্দেশিত সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন। আইআরজিসি এই অভিযোগের কোনো তাত্ক্ষণিক মন্তব্য দেয়নি। একই সময়ে লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা (এনএনএ) জানায় যে আরেকটি ড্রোন আক্রমণে বিন্ত জবেইল জেলার সাফাদ আল-ব্যাটিখ শহরের প্রবেশদ্বারে একটি পিকআপ ট্রাক ধ্বংস হয়।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যে দক্ষিণ লেবাননে হেজবোল্লার আরেকজন সদস্যকে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। নভেম্বর ২০২৪ সালে গাজা যুদ্ধের পর লেবাননের সঙ্গে একটি স্থগিত যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হয়, তবে ইসরায়েলি বাহিনীর মতে এই বিরতি পরবর্তী সময়ে প্রায় প্রতিদিন লেবাননে আকাশীয় আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবারের আক্রমণগুলোর আগে, বুধবার রাতের দিকে তিরে জেলার জেনাটায় একটি গাড়ি লক্ষ্য করে ড্রোন আক্রমণ ঘটে, যেখানে পথচারী একজন আহত হন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, স্থগিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি শক্তি লেবাননে ৩০০ টিরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছে, যার মধ্যে প্রায় ১২৭ জন বেসামরিক নাগরিক। যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র সংঘাত অবস্থান ও ঘটনা ডেটা প্রকল্প (ACLED) অনুসারে, জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর দ্বারা প্রায় ১,৬০০টি আকাশীয় আক্রমণ লেবাননে চালানো হয়েছে।
ইসরায়েলি সরকার দাবি করে যে এই ধারাবাহিক আক্রমণগুলো হেজবোল্লার যোদ্ধা ও অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে করা হচ্ছে, এবং স্থগিত যুদ্ধবিরতির শর্তে হেজবোল্লার সম্পূর্ণ অস্ত্রনিরস্ত্রীকরণ দাবি করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ইসরায়েলি নীতি ও লেবাননের নিরাপত্তা পরিস্থিতির জটিলতা তুলে ধরছেন। একজন মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেন, “ইসরায়েলি আক্রমণগুলো কেবল হেজবোল্লার বিরুদ্ধে নয়, বরং ইরানের প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করার কৌশলগত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়।” অন্যদিকে, লেবাননের সরকারী মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেন, “লেবাননের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বন্ধ না করা পর্যন্ত কোনো শান্তি আলোচনা অগ্রসর হবে না।”
এই পরিস্থিতি অঞ্চলের কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরায়েলি আক্রমণকে নিন্দা করে এবং লেবাননের সঙ্গে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে, ইরান তার কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ইসরায়েলি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে, যদিও সরাসরি কোনো সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়নি।
ভূগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, হেরমেল, বিন্ত জবেইল এবং তিরে জেলার আক্রমণগুলো লেবাননের দক্ষিণ ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এই এলাকাগুলো হেজবোল্লার গেরিলা যুদ্ধের মূল ভিত্তি এবং ইরানের সরবরাহ লাইন হিসেবে বিবেচিত হয়। ভবিষ্যতে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা লেবাননের সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও মানবিক ক্ষতির মাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে থাকবে।
পরবর্তী সময়ে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে লেবানন-ইসরায়েল সংঘাতের ওপর আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষের আক্রমণ ও প্রতিক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বিতর্ক হবে। একই সঙ্গে, লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলোও এই ক্রমবর্ধমান হিংসা মোকাবিলায় জাতীয় সংহতি গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
সারসংক্ষেপে, ইসরায়েলি ড্রোন আক্রমণে আইআরজিসি সদস্যসহ একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে, এবং লেবাননে চলমান সংঘাতের ফলে মানবিক ক্ষতি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক চাপ ও মানবিক সহায়তা এই পরিস্থিতির সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



