মঙ্গলবার, ভারতীয় নৌবাহিনীর পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন আইএনএস আরিঘাট বাঙোপসাগরের বিশাখাপত্তনম উপকূলের কাছ থেকে কে-৪ নামের মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। এই পরীক্ষা দেশের সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক আক্রমণ ক্ষমতাকে নতুন স্তরে উন্নীত করেছে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশে ভারতের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
কে-৪ ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পৌঁছানোর দূরত্ব প্রায় তিন হাজার পাঁচশো কিলোমিটার, যা সমুদ্রের মধ্যে বা ভূখণ্ডে অবস্থিত লক্ষ্যবস্তুতে সুনির্দিষ্ট আঘাত হানতে সক্ষম। এই পরিসীমা ভারতের কৌশলগত অস্ত্রশস্ত্রের তালিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, কারণ এটি দেশের সমুদ্র থেকে দীর্ঘ দূরত্বে পারমাণবিক হুমকি প্রয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করে।
২৯ আগস্ট ২০২৩ তারিখে ভারতীয় নৌবাহিনীর কে-৪ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর থেকে সাবমেরিন ভিত্তিক এই সিস্টেমের উন্নয়ন ও পরীক্ষা চলমান, এবং আজকের সফল উৎক্ষেপণ প্রথমবারের মতো সমুদ্র থেকে এই ধরনের দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে।
এই অর্জনের ফলে ভারত বিশ্বে কয়েকটি দেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যাদের কাছে স্থল, আকাশ এবং সমুদ্র—এই তিনটি ক্ষেত্র থেকে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা (নিউক্লিয়ার ট্রায়াড) রয়েছে। ট্রায়াডের সম্পূর্ণতা কৌশলগত স্থিতিশীলতা বাড়ায় এবং বৈশ্বিক শক্তি ভারসাম্যে ভারতের অবস্থানকে দৃঢ় করে।
কে-৪ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা অগ্নি-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি, যা ভারতের দীর্ঘতম পাল্লার সমুদ্র-উৎক্ষেপণযোগ্য কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে পরিচিত। মূল সংস্করণে বিশেষ পরিবর্তন আনা হয়েছে, যাতে এটি সমুদ্রের নিচের পরিবেশে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে এবং সাবমেরিনের গতি ও গভীরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
প্রায় আড়াই টন ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্র পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম এবং ভারতের আরিহান্ত শ্রেণির সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণ করা যাবে। আরিহান্ত শ্রেণির সাবমেরিনগুলি গভীর সমুদ্রে দীর্ঘ সময় নিঃশব্দে গমন করতে সক্ষম, যা তাদেরকে গোপনীয়ভাবে টহল ও হুমকি প্রদান করার সুযোগ দেয়।
কে-৪ সিরিজের নামকরণ করা হয়েছে ভারতের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপি জে আব্দুল কালামের সম্মানে, যিনি দেশের ইন্টিগ্রেটেড গাইডেড মিসাইল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এই নামকরণটি দেশের বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রতি সম্মানসূচক।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, কে-৪ ভারতের পারমাণবিক সক্ষমতার সবচেয়ে গোপনীয় অংশ হিসেবে বিবেচিত, কারণ এটি সাবমেরিনের গভীর গোপনীয়তা ও দীর্ঘস্থায়ী টহল ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। এই ধরনের সিস্টেমের সফল পরীক্ষা দেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে আরও দৃঢ় করে এবং সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
এই পরীক্ষার ফলাফলকে ভিত্তি করে, নীতি নির্ধারক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক ক্ষমতার রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রযুক্তি কীভাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করা যাবে, তা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।



