প্রখ্যাত ফিলিস্তিনি অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহাম্মদ বাকরি গ্যালিলি মেডিকেল সেন্টার, নাহারিয়ায় বুধবার মৃত্যুবরণ করেন। ৭২ বছর বয়সে তিনি হৃদয় ও ফুসফুসের সমস্যার কারণে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তার মৃত্যু ফিলিস্তিনি সিনেমার পাঁচ দশকের উজ্জ্বল ইতিহাসের সমাপ্তি চিহ্নিত করে।
বাকরি ১৯৫৩ সালে গ্যালিলি অঞ্চলের বীনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ইসরায়েলি নাগরিকত্বের অধীনে বেড়ে ওঠেন। তিনি তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ে আরব সাহিত্য ও থিয়েটার অধ্যয়ন করেন, যা তার শিল্পীজীবনের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। শৈশবের এই শিক্ষা তাকে পরবর্তীতে নাট্য ও চলচ্চিত্রে গভীরভাবে যুক্ত হতে সহায়তা করে।
বাকরির চলচ্চিত্র জগতের প্রথম পদক্ষেপ আসে তিনি ত্রিশ বছর বয়সে কোস্টা-গাভ্রাসের ‘হানা কে’ ছবিতে একটি ফিলিস্তিনি শরণার্থী চরিত্রে অভিনয় করার মাধ্যমে। এই ভূমিকা তাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিচিতি এনে দেয় এবং পরবর্তী বছরগুলোতে তার ক্যারিয়ারকে মজবুত করে।
১৯৮৪ সালে ইসরায়েলি চলচ্চিত্র ‘বিয়ন্ড দ্য ওয়ালস’‑এ ফিলিস্তিনি বন্দী চরিত্রে তার অভিনয় আন্তর্জাতিক প্রশংসা পায়। এই ছবিটি একাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য নোমিনেশন পায়, যা বাকরির শিল্পীজীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। তার অভিনয়শৈলী ও দৃঢ় চরিত্রচিত্রণ ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি উভয় দর্শকের মন জয় করে।
বাকরির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি হল ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘জেনিন, জেনিন’ ডকুমেন্টারি। এই চলচ্চিত্রটি জেনিন শিবিরে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান পরবর্তী ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করে, যেখানে ৫২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়। ছবিটি ঘটনাস্থলের কাঁচা বাস্তবতা তুলে ধরে এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
‘জেনিন, জেনিন’ বহু বছর ধরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে যায়। ২০২১ সালে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ছবিটি প্রদর্শন থেকে নিষিদ্ধ করে, এবং ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তা অবৈধ ঘোষিত হয়, কারণ তা ‘অবমাননাকর’ বলে বিবেচিত হয়। আদালত ছবির সব কপি জব্দ করে এবং অনলাইন লিঙ্কগুলো মুছে ফেলার আদেশ দেয়, ফলে বাকরির ওপর শত হাজার শেকেল জরিমানা আরোপিত হয়।
বাকরি এই নিষেধাজ্ঞা ও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে তার সত্যের জন্য লড়াই চালিয়ে যান। তিনি একবার প্রকাশ্যে উল্লেখ করেন যে তিনি ইসরায়েলকে শত্রু হিসেবে দেখেন না, তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাকে শত্রু ও দেশদ্রোহী হিসেবে গণ্য করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তার শিল্পকর্মকে রাজনৈতিক প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার করে তুলেছে।
বাকরির ক্যারিয়ার কেবল অভিনয়েই সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি বহু চলচ্চিত্রে পরিচালনা ও প্রযোজনা কাজেও যুক্ত ছিলেন। তার কাজগুলো ফিলিস্তিনি সংস্কৃতির আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিলিস্তিনি কণ্ঠস্বরকে শোনাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বহু দশক ধরে তিনি সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে লড়াই করে ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্রকে স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তার আইনি লড়াইগুলো ফিলিস্তিনি শিল্পীদের জন্য একটি রেফারেন্স পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
মোহাম্মদ বাকরির মৃত্যু ফিলিস্তিনি সিনেমার একটি বড় ক্ষতি, তবে তার সৃষ্টিকর্ম ও আদর্শ ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য পথপ্রদর্শক থাকবে। তার ডকুমেন্টারি, নাট্যকর্ম এবং চলচ্চিত্রে প্রকাশিত মানবিক মূল্যবোধ আজও দর্শকদের হৃদয়ে গাঁথা।
পাঠকগণ যদি ফিলিস্তিনি সংস্কৃতির গভীরতা ও ইতিহাস বুঝতে চান, তবে বাকরির ‘জেনিন, জেনিন’ এবং ‘বিয়ন্ড দ্য ওয়ালস’ সহ তার অন্যান্য কাজগুলো দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়। এসব চলচ্চিত্র তার শিল্পীজীবনের বিভিন্ন দিককে উন্মোচন করে এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।
বাকরির জীবন ও কাজের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্রের বিকাশ, সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ



