নূরজাহান বেগম, যিনি ছোটবেলায় নূরুন নাহার নামে পরিচিত, ৪ জুন ১৯২৫ তারিখে চাঁদপুরের চালিতালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন, শাওগাতের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক, তাকে সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে নানা বিদেশি ও দেশীয় পত্রিকায় ছবি দেখার সুযোগ দেন। ১৯২৯ সালে দু’বার ডুবে যাওয়ার ঝুঁকির পর পরিবারকে কলকাতায় স্থানান্তর করা হয়, যেখানে নূরজাহানের শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
কোলকাতা, তখনের বাঙালি সংস্কৃতির কেন্দ্র, নূরজাহানের জন্য এক নতুন পরিবেশের সূচনা করে। তার পিতা, যিনি শাওগাতের কাজের পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগে প্রকাশনা চালাতেন, পরিবারকে শহরে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে প্রচলিত রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের বিরোধের মুখোমুখি হন। তবু নূরজাহানের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার ইচ্ছা তাকে বাধা অতিক্রম করতে প্রেরণা দেয়।
শহরে পৌঁছে নূরজাহানের প্রথম পরিবর্তন ছিল তার চেহারার সরলীকরণ; পিতার ইচ্ছা অনুযায়ী বড় নাকের পিন ও লম্বা চুল কেটে দেওয়া হয়, যা তাকে আধুনিক সমাজে আত্মবিশ্বাসীভাবে চলার সুযোগ দেয়। তার মা ফাতেমা বেগম বাংলা বর্ণমালা শেখান, আর নাসিরুদ্দিন ইংরেজি ও আরবী বর্ণমালা পরিচয় করিয়ে দেন। এভাবে নূরজাহান শৈশব থেকেই বহুভাষিক ভিত্তি গড়ে তোলেন।
শাওগাতের অফিস, ১১ ওয়েলসলি স্ট্রিটে অবস্থিত, নূরজাহানের জন্য জ্ঞান ও সংস্কৃতির মিলনস্থল হয়ে ওঠে। সেখানে তিনি কাজি নাজরুল ইসলাম, আবুল মনসুর আহমেদ, কাজি মোতাহার হোসেনসহ সময়ের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে পরিচিত হন। এই সাক্ষাৎকারগুলো তার দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে নারীর অধিকার ও শিক্ষার ক্ষেত্রের প্রতি তার আগ্রহকে তীব্র করে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে নূরজাহানের অবদান তার জীবনের পরবর্তী দশকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি নারী শিক্ষার প্রসার ও সমতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন প্রকাশনা ও কর্মশালার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করেন। তার লেখনী ও সম্পাদকীয় কাজের মাধ্যমে তিনি নারী কণ্ঠকে সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন, যা ঐ সময়ের রক্ষণশীল মনোভাবকে চ্যালেঞ্জ করে।
শাওগাতের পাশাপাশি নূরজাহান নিজস্ব উদ্যোগে নারী শিক্ষার উপর নিবন্ধ ও গবেষণা প্রকাশ করে, যা শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য মূল্যবান রেফারেন্স হয়ে দাঁড়ায়। তার প্রচেষ্টা বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে সহায়ক হয়, যেখানে নারীর শিক্ষার হার এখনও কম।
২০২৫ সালে নূরজাহান বেগমের শতবর্ষী জন্মদিন উদযাপিত হওয়ায় তার জীবন ও কর্মের পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। তার দীর্ঘায়ু কেবল বয়সের নয়, বরং নারীর স্বায়ত্তশাসন ও শিক্ষার প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতির প্রতীক। আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় তার আদর্শকে অনুসরণ করে আরও সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গড়ে তোলা সম্ভব।
শিক্ষা ক্ষেত্রে নূরজাহানের গল্প থেকে আমরা শিখতে পারি যে, শিশুকাল থেকেই বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তোলা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই ধরনের সাফল্য অর্জন কঠিন।
আপনার সন্তান বা শিক্ষার্থীর জন্য যদি আপনি নূরজাহানের মতো সমন্বিত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে চান, তবে তাদেরকে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বিষয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন, এবং তাদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা দিন। এভাবেই ভবিষ্যতের নারী নেতাদের গড়ে তোলা সম্ভব।



