প্রথম বেতন পাওয়া নতুন কর্মজীবী তরুণদের জন্য এক ধরনের মাইলফলক। প্রথম চেক হাতে নিলেই আনন্দের স্রোত, আত্মবিশ্বাসের উত্থান এবং বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করার ইচ্ছা স্বাভাবিক। তবে এই মুহূর্তে অতিরিক্ত ব্যয় করা ভবিষ্যতে আর্থিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়, প্রথম বেতন পাওয়ার পর অনেকেই আয়কে অতিরিক্ত খরচে রূপান্তরিত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা হ্রাস করে।
একটি সহজ উপমা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়: আমাদের জীবনধারা একটি বেলুনের মতো, আর আয় হল বেলুনে ঢোকানো বাতাস। যত বেশি বাতাস ঢুকবে, বেলুন তত উঁচুতে যাবে এবং আরামদায়ক জীবনযাপন সম্ভব হবে। তবে অতিরিক্ত বাতাস বেলুনকে ফাটিয়ে দিতে পারে, ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ও একইভাবে আর্থিক ভারসাম্যকে ক্ষয় করে।
একজন ২৭ বছর বয়সী সরকারি কর্মচারী, তাসমিন ইসলাম ইশা, নিজের প্রারম্ভিক কর্পোরেট জীবনের ব্যয়বহুল অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। তিনি বলেন, সবকিছু একসাথে আপগ্রেড করার দরকার নেই; এক সময়ে একটিই পরিবর্তন করা উচিত, যাতে জীবনধারা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। তার মতে, আয়কে নির্দিষ্ট শতাংশে ভাগ করা সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। তিনি প্রস্তাব করেন, মোট আয়ের ৩০ শতাংশ সঞ্চয়ে, ২০ শতাংশ বিনিয়োগে, ১০ শতাংশ জরুরি তহবিলে এবং অবশিষ্ট অংশটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যয় হিসেবে ব্যবহার করা।
এই ভাগাভাগি পদ্ধতি আর্থিক পরিকল্পনার দ্বিতীয় সাধারণ ভুলকে দূর করে, যা হল সঞ্চয় ও বিনিয়োগের দেরি করা। আর্থিক বই, পরামর্শদাতা এবং অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা সবসময়ই শুরুর থেকেই সঞ্চয় ও বিনিয়োগ শুরু করার পরামর্শ দেন। কারণ, ছোট ছোট বিনিয়োগ সময়ের সাথে সাথে চক্রবৃদ্ধি সুদের মাধ্যমে বড় রূপ নেয়। তাছাড়া, তরুণ বয়সে আর্থিক লক্ষ্য নির্ধারণ করলে ভবিষ্যতের বড় ব্যয়, যেমন বাড়ি কেনা, সন্তান শিক্ষা বা অবসরকালীন পরিকল্পনা সহজে পূরণ করা যায়।
প্রথম বেতন পাওয়ার পর বেশিরভাগই তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি খুঁজে পায়, কিন্তু তাসমিনের মতামত অনুসারে, দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য পরিকল্পনা প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, আয়কে ভাগ করে সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং জরুরি তহবিলের জন্য নির্ধারিত অংশে রাখলে অপ্রত্যাশিত খরচে আর্থিক চাপ কমে যায়। জরুরি তহবিলের পরিমাণ সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের জীবিকা ব্যয় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে অপ্রত্যাশিত রোগ, চাকরি হারানো বা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে সুরক্ষা থাকে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে, তরুণদের জন্য স্টক, মিউচুয়াল ফান্ড বা পিএফডি মত নিরাপদ বিকল্পগুলো উপযুক্ত। যদিও ঝুঁকি থাকে, তবে সময়ের সাথে সাথে ঝুঁকি কমে যায় এবং রিটার্ন বাড়ে। তাছাড়া, নিয়মিতভাবে ছোট পরিমাণে বিনিয়োগ করা, একবারে বড় পরিমাণে না করে, বাজারের ওঠানামা সামলাতে সাহায্য করে।
সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন থেকে নির্দিষ্ট শতাংশ আলাদা করে রাখা সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বয়ংক্রিয় স্থানান্তর সেবা ব্যবহার করে, সঞ্চয়কে স্বয়ংক্রিয় করা যায়, ফলে ব্যয় করার ইচ্ছা কমে এবং সঞ্চয় স্বাভাবিকভাবে বাড়ে। তাছাড়া, সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করলে তা অর্জনের জন্য প্রেরণা বাড়ে; উদাহরণস্বরূপ, ছুটিতে ভ্রমণ, বাড়ি কেনা বা কোনো বিশেষ ইলিশের পণ্য কেনা।
প্রথম বেতন ব্যবহারের সময় আরেকটি সাধারণ ভুল হল সবকিছুই আপগ্রেড করার তাড়না। নতুন গ্যাজেট, ফ্যাশন আইটেম বা উচ্চমানের রেস্টুরেন্টে খরচ বাড়িয়ে তোলা স্বল্পমেয়াদে আনন্দ দেয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যকে ক্ষুণ্ন করে। তাই, প্রয়োজনীয়তা ও ইচ্ছার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। তাসমিনের মতামত অনুসারে, এক সময়ে একটিই বড় ক্রয় করা উচিত, যাতে আর্থিক ভারসাম্য বজায় থাকে।
সারসংক্ষেপে, প্রথম বেতন পাওয়ার পর আর্থিক পরিকল্পনা না করলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। আয়কে নির্দিষ্ট শতাংশে ভাগ করে সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং জরুরি তহবিল গঠন করা, এবং ধীরে ধীরে জীবনধারা উন্নত করা সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। তাছাড়া, ছোট ছোট বিনিয়োগের চক্রবৃদ্ধি প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সময়ের সাথে সাথে সম্পদ বৃদ্ধি করা সম্ভব।
অবশেষে, নতুন কর্মজীবী তরুণদের জন্য একটি ব্যবহারিক টিপস: বেতন পাওয়ার পর প্রথম সপ্তাহে কোনো বড় ব্যয় না করে, আয়ের ৩০ শতাংশ সঞ্চয় হিসাব করে আলাদা করুন, এবং বাকি অংশটি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করুন। এই সহজ অভ্যাস ভবিষ্যতে আর্থিক নিরাপত্তা এবং স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করবে।



