গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, ইসরায়েলি ড্রোনের আক্রমণে লেবাননের হেরমেল জেলার হোশ আল-সায়েদ আলি রোডে চলমান একটি মিনিবাসে দুইজনের প্রাণহানি ঘটেছে। ঘটনাটি বৃহস্পতিবার ঘটেছে এবং লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা (NNA) সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই আক্রমণটি সাম্প্রতিক দিনে লেবাননের সীমান্তে ধারাবাহিক লঙ্ঘনের ধারাবাহিক অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ড্রোনের আঘাতটি হেরমেল জেলার হোশ আল-সায়েদ আলি রোডে চলমান একটি যাত্রীবাহী মিনি বাসে হিট করেছে, যেখানে বাসে যাত্রীরা স্থানীয় বাজারে যাত্রা করছিল। আক্রমণের ফলে দুইজনের মৃত্যু এবং অন্যদের আঘাতের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেছে।
ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র অবিচায় আদ্রা (Avichay Adraee) টুইটারে জানিয়েছেন যে, এই আক্রমণটি পূর্ব লেবাননের আল-নাসিরিয়াহ অঞ্চলে একটি ‘সন্ত্রাসী অপারেটিভ’কে লক্ষ্য করে করা হয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, লক্ষ্যবস্তু ইসরায়েলি নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছিল। এই বিবৃতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ড্রোন আক্রমণটি ঘটার কয়েক ঘণ্টা আগে, তিরের জেনাটা শহরে একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে আরেকটি ড্রোন আঘাত করে একজন পথচারী আহত হয়েছিলেন। ওই ঘটনার সময় গাড়ি চলমান অবস্থায় ছিল এবং আক্রমণের ফলে গাড়ির সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ধারাবাহিক আক্রমণগুলো লেবাননের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর নভেম্বরের সাময়িক চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ৩০০ের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১২৭ জন বেসামরিক। এই সংখ্যাগুলো লেবাননের মানবিক সংকটকে তীব্রতর করে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রোজেক্ট (ACLED) অনুসারে, জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননে প্রায় ১,৬০০টি আকাশীয় আক্রমণ চালিয়েছে। এই ডেটা ইসরায়েলি বাহিনীর ধারাবাহিক আক্রমণকে স্পষ্টভাবে চিত্রিত করে এবং অঞ্চলের স্থিতিশীলতা হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়।
নভেম্বর ২০২৪-এ ইসরায়েল এবং হিজবুলা গোষ্ঠীর মধ্যে একটি সাময়িক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা এক বছরের বেশি সময় ধরে সীমান্তে সংঘটিত পারস্পরিক আক্রমণ বন্ধ করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর লেবাননে আক্রমণ প্রায় প্রতিদিনের মতো ঘটছে, যা চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এই ধারাবাহিক আকাশীয় আক্রমণকে হিজবুলার যোদ্ধা ও তাদের অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে করা বলে যুক্তি দেয়। তারা দাবি করে যে, হিজবুলা সম্পূর্ণভাবে অস্ত্রমুক্ত করা চুক্তির শর্তের অংশ এবং তাই আক্রমণগুলো বৈধ প্রতিরক্ষা হিসেবে গণ্য। এই যুক্তি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনায় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
হিজবুলা গোষ্ঠী দীর্ঘদিন থেকে অস্ত্রমুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দাবি করে যে, তাদের অস্ত্র লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য। গোষ্ঠী যুক্তি দেয় যে, ইসরায়েলি আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করতে অস্ত্রধারী থাকা একমাত্র উপায়। এই অবস্থান লেবাননের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
হিজবুলা সম্প্রতি লেবাননের সরকারকে ইসরায়েলি হুমকির মুখে অস্ত্রমুক্তি শর্ত গ্রহণ না করার আহ্বান জানিয়েছে। গোষ্ঠী জোর দিয়ে বলেছে যে, লেবাননের কর্তৃপক্ষকে জাতীয় গর্ব ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং শত্রুর শর্তে আত্মসমর্পণ করা উচিত নয়। এই দাবি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।
লেবাননের সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দেশের দক্ষিণে হিজবুলা গোষ্ঠীর অস্ত্রমুক্তি প্রক্রিয়া শেষের কাছাকাছি। সরকার দাবি করে যে, এই প্রক্রিয়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের পুনর্গঠনেও সহায়তা করবে। তবে হিজবুলার অব্যাহত বিরোধী অবস্থান এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইসরায়েলি আক্রমণের তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং উভয় পক্ষকে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার আহ্বান জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও লেবাননে মানবিক সহায়তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এই বহুপাক্ষিক চাপের ফলে ভবিষ্যতে কোনো শান্তি চুক্তি পুনরায় আলোচনার সম্ভাবনা উত্থাপিত হয়েছে।
একজন মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেছেন, “ইসরায়েলি ড্রোন আক্রমণ এবং হিজবুলার অস্ত্রধারার দ্বন্দ্ব লেবাননের নিরাপত্তা কাঠামোকে অস্থির করে তুলছে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় হস্তক্ষেপ ছাড়া এই চক্র ভাঙা কঠিন।” এই বিশ্লেষণ বর্তমান পরিস্থিতির জটিলতা ও সমাধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, যদি উভয় পক্ষের আক্রমণ বাড়তে থাকে, তবে লেবাননের গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি পুনরায় উন্মোচিত হতে পারে এবং শরণার্থী সংকট আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে, ইসরায়েলি নিরাপত্তা নীতি যদি কঠোরভাবে অব্যাহত থাকে, তবে আন্তর্জাতিক আইনি ও মানবিক দায়িত্বের প্রশ্ন তীব্র হবে। তাই, ভবিষ্যতে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে শর্তাবলী পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, ইসরায়েলি ড্রোনের সাম্প্রতিক আক্রমণ লেবাননের পূর্বাঞ্চলে দুইজনের মৃত্যুর কারণ হয়েছে এবং এটি সাময়িক চুক্তি সত্ত্বেও চলমান লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে। উভয় পক্ষের নিরাপত্তা ও মানবিক উদ্বেগের সমাধান ছাড়া এই সংঘাতের অবসান কঠিন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত পদক্ষেপ এবং লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমে এই উত্তেজনা কমানো সম্ভব হতে পারে।



