নিউইয়র্কের সোনার ফরোয়ার্ড মার্কেটে এই বছর ৭১ শতাংশের চরম বৃদ্ধি রেকর্ড হয়েছে, যা ১৯৭৯ সালের পর সর্বোচ্চ বৃদ্ধি হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৭৯ সালে জিমি কার্টার প্রেসিডেন্সির সময় মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র সংকট, ইরানের ইসলামিক বিপ্লব, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সংকটের ফলে সোনার দাম এক বছরে ১২৬ শতাংশ বেড়েছিল; তখন দাম আউন্সে ২২৬ ডলার থেকে ৫১২ ডলারে পৌঁছেছিল। ৪৬ বছর পর, এই বছরের ফরোয়ার্ড লেনদেনে ৭১ শতাংশের উত্থান দেখায় যে সোনার বাজারে অনন্য উত্থান ঘটেছে, আর অন্য কোনো বছর এ রকম বৃদ্ধি দেখায়নি।
বাজারের তুলনায় অন্যান্য সম্পদে মুনাফা তুলনামূলকভাবে কম। ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের S&P 500 সূচক প্রায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে একই সময়ে সোনার ফরোয়ার্ড লেনদেনে ২৭ শতাংশের লাভ হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে S&P 500 প্রায় ২৪ শতাংশ বাড়লেও, সোনার দামের উত্থান এখনও বেশি গতিশীলতা দেখিয়েছে। এই পার্থক্যটি বিনিয়োগকারীদের জন্য সোনাকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পুনরায় উজ্জ্বল করেছে।
ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার ২০২৬ সালে আরও হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে, যা সোনার চাহিদা বাড়ানোর আরেকটি চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে, ডলার দুর্বল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে সোনার ক্রয়মূল্য কমে যাচ্ছে, ফলে সোনার চাহিদা তীব্রতর হচ্ছে। এই মুদ্রা-সাপেক্ষ গতিবিদ্যা সোনার মূল্যের ধারাবাহিক বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও সোনার মজুতে বাড়তি আগ্রহ দেখাচ্ছে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষভাবে সোনার সংরক্ষণ বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ও ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চায়। এই কৌশলটি ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর ত্বরান্বিত হয়, যখন পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ডলারে সংরক্ষিত সম্পদ জব্দ করে। ফলে রাশিয়া ও চীন উভয়ই ডলারের ঝুঁকি কমাতে বিকল্প সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকেছে।
স্যাক্সো ব্যাংকের পণ্য কৌশল বিভাগের প্রধানের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনার ক্রয় মূলত ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগের ফলে চালিত। সার্বভৌম রিজার্ভের জব্দ এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান বিভাজন সোনার চাহিদায় নতুন কাঠামোগত মাত্রা যোগ করেছে। এই প্রবণতা শীঘ্রই স্থায়ী হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে, কারণ দেশগুলো আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতে সোনার মতো ঐতিহ্যবাহী সম্পদে বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলেছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ধারাবাহিকভাবে সোনার মজু বাড়িয়ে চলেছে। প্রতিটি বছর তাদের মোট সোনার সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে, যা সোনার বাজারের দীর্ঘমেয়াদী শক্তি এবং স্থিতিশীলতা নির্দেশ করে। এই ধারাবাহিকতা সোনার দামকে ভবিষ্যতে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫ সালে সোনার দামের ৭১ শতাংশের উত্থান ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশাল মাইলফলক। মুদ্রা দুর্বলতা, ফেডের সুদের হার হ্রাস, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনার ক্রয়—all এই উপাদানগুলো একসাথে সোনার বাজারকে শক্তিশালী করেছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য সোনার দামের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং অন্যান্য সম্পদের তুলনায় উচ্চ রিটার্ন সম্ভাবনা একটি স্পষ্ট সংকেত দেয় যে সোনার প্রতি আগ্রহ ভবিষ্যতেও বাড়তে থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, যদিও সোনার দাম বাড়ছে, তবে বাজারের অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এখনও উচ্চ। তাই বিনিয়োগকারীদের উচিত পোর্টফোলিওতে সোনার অংশকে যুক্তিসঙ্গতভাবে সমন্বয় করা, যাতে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও রিটার্নের ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।



