ইসরায়েলি গাজা যুদ্ধ ২০২৩ থেকে চলমান অবস্থায়, ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানরা ২০২৪ সালের ক্রিসমাস প্রথমবারের মতো বেথলেমের নাতাল গির্জায় একত্রিত হয়েছে। এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি শহরের মেয়র কর্তৃক দীর্ঘ সময়ের নিঃশব্দের পর পুনরায় চালু করা হয়েছে, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্তর্জাতিক পর্যটকরা অংশগ্রহণ করেছে।
বেথলেমের মেয়র জানান, শহরের ঐতিহ্যবাহী উৎসব পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি, যাতে বাসিন্দাদের মনোবল বাড়ে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতীক রক্ষা পায়। গির্জার আশেপাশে ক্রিসমাস মার্কেটও স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে স্থানীয় বিক্রেতারা হস্তশিল্প, খাবার ও ধর্মীয় সামগ্রী বিক্রি করে।
বেথলেমের এক মা, সাফা থালগিয়েহ, তার সন্তানদের সঙ্গে উপস্থিত হয়ে বললেন, আনন্দের মুহূর্তে তারা এখনও কষ্ট, ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি, তবে প্রার্থনা ও আশা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। তার কথায় স্পষ্ট হয়েছে যে, ধর্মীয় উদযাপন ও মানবিক কষ্টের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রয়েছে।
খ্রিস্টান ধর্মের প্রাচীনতম সম্প্রদায়গুলোর একটি হিসেবে ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানদের ইতিহাস বাইবেলের বর্ণনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। মেরি ও যোসেফের নাতাল গির্জার স্থানে যাত্রা করে যীশুর জন্মের কাহিনী এই শহরের ধর্মীয় গুরুত্বকে বাড়িয়ে দেয়। প্রতি বছর ক্রিসমাসে বিশ্বব্যাপী খ্রিস্টান ভক্তরা এই পবিত্র স্থানে আসেন, তবে বর্তমান সময়ে ইসরায়েলি চেকপয়েন্ট, অবৈধ বসতি ও বিচ্ছিন্নতা প্রাচীরের কারণে ভ্রমণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০১৭ সালের জনগণনা অনুযায়ী, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানদের সংখ্যা ৫০,০০০-এর কম, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। ২০শ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই অনুপাত প্রায় ১২ শতাংশ ছিল। দীর্ঘস্থায়ী দখল, অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তা সীমাবদ্ধতা তাদের জীবনের মানকে প্রভাবিত করে, ফলে অনেক পরিবার বিদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
আজকের অধিকাংশ ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বাস করে, যেখানে প্রায় ৪৭,০০০ থেকে ৫০,০০০ জনের মধ্যে সংখ্যা সীমাবদ্ধ। গাজায় যুদ্ধের পূর্বে প্রায় ১,০০০ জন বাস করতেন, তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে তাদের উপস্থিতি হ্রাস পেয়েছে। পশ্চিম তীরে তিনটি প্রধান শহরে এই সম্প্রদায়ের ঘনত্ব বেশি, যদিও নির্দিষ্ট নাম এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানরা অন্যান্য ফিলিস্তিনি জনগণের মতোই চলাচল, কাজ ও ধর্মীয় কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার গোষ্ঠী এই সীমাবদ্ধতাকে ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা সম্প্রতি বেথলেমে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইউএন মানবাধিকার কাউন্সিলের একটি প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ধর্মীয় স্থানগুলোতে প্রবেশের বাধা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানদের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। বিশেষ করে ক্রিসমাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসবে এই বাধা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সমালোচিত হয়েছে।
বেথলেমের মেয়র ও স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা একত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়াতে কাজ করছেন, যাতে গির্জা ও বাজারে উপস্থিতি নিরাপদ থাকে। ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে চেকপয়েন্টের সময়সূচি সমন্বয় করা হয়েছে, যদিও এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতি ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। জনসংখ্যার হ্রাস, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ও মানবিক সহায়তা এই সম্প্রদায়ের টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
বেথলেমে ক্রিসমাস উদযাপন, যদিও সীমাবদ্ধতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানদের আত্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই উদযাপন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য একটি সূচক, যা দেখায় কীভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবিক সহনশীলতা সংঘাতের মাঝেও বজায় রাখা সম্ভব।



