১৯৭৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর, কার্ডিফের একটি মধ্যবয়সী দম্পতি রব পার্সনস ও ডিয়ান পার্সনসের দরজায় অপ্রত্যাশিত এক অতিথি এসে দাঁড়ালেন। হাতে একটি বিনি ব্যাগ এবং অন্য হাতে জমাট বাঁধা মুরগি নিয়ে তিনি দরজায় নক করলেন, যা পরবর্তীতে তাদের জীবনের দিক বদলে দিল। দম্পতি তখনই রোনি লকউড নামের এক তরুণকে স্বাগত জানালেন, যাকে তারা পরে ৪৫ বছর ধরে পরিবারের অংশ হিসেবে রাখলেন।
রোনি যখন দরজায় উপস্থিত হলেন, তার হাতে থাকা ব্যাগে তার সামান্য জিনিসপত্র এবং একটি হিমায়িত মুরগি ছিল। রব তার মুখ দেখে কিছুটা চিনতে পারলেন; তিনি রোনিকে ছোটবেলায় সানডে স্কুলে দেখেছেন এবং তাকে “কিছুটা ভিন্ন” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। রোনি মুরগি সম্পর্কে বললেন যে কেউ তাকে ক্রিসমাসে উপহার হিসেবে দিয়েছে, তখন রব দু’টি শব্দে তার দরজা খুলে দিলেন – “আসো”।
রব ও ডিয়ান তখন যথাক্রমে ২৭ ও ২৬ বছর বয়সী ছিলেন এবং তাদের বিবাহ মাত্র চার বছর পূর্ণ হয়েছিল। রোনি, যিনি অটিজমে আক্রান্ত ছিলেন, তখন প্রায় ত্রিশের কাছাকাছি বয়সের এবং ১৫ বছর বয়স থেকে বাড়ি ছাড়া জীবনে কাটিয়ে আসছিলেন। তিনি কার্ডিফের বিভিন্ন স্থানে কাজ করে গিয়েছিলেন এবং কখনো কখনো রবের পরিচালিত যুবক্লাবে দেখা যেত।
দম্পতি রোনিকে তৎক্ষণাৎ খাবার দিলেন, মুরগি রান্না করে তার জন্য গরম করে দিলেন এবং তাকে স্নান করিয়ে দিলেন। তারা তাকে ক্রিসমাসের জন্য বাড়িতে থাকতে দিলেন, যদিও মূল পরিকল্পনা ছিল মাত্র একদিনের জন্য। ডিয়ান মনে রাখেন, রোনি যখন টেবিলে বসে উপহারগুলো খুলছিলেন, তখন তার চোখে অশ্রু ভাসছিল, কারণ তিনি প্রথমবারের মতো প্রেম ও যত্নের অনুভূতি পেয়েছিলেন।
প্রাথমিকভাবে রোনিকে ক্রিসমাসের পরের দিন পর্যন্ত বাড়ি ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন, তবে তার বিদায়ের মুহূর্তে দম্পতি তার ওপর দয়া হারাতে পারলেন না। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নিয়ে তারা রোনিকে বাড়িতে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। এরপর থেকে রোনি পরিবারের অংশ হয়ে গেলেন, এবং তাদের ঘরে তার উপস্থিতি ধীরে ধীরে রুটিনে পরিণত হল।
বছরের পর বছর, রোনি এবং দম্পতির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সমঝোতা গড়ে উঠল। রোনি কখনো কখনো কাজের জন্য বাইরে যেত, আবার কখনো বাড়িতে বসে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতেন। রব ও ডিয়ান তার জন্য ছোটখাটো উপহার—মোজা থেকে শুরু করে সুগন্ধি পণ্য—দিয়ে তার জীবনে আনন্দের ছোঁয়া যোগ করতেন।
এই অনন্য বন্ধন ৪৫ বছর ধরে টিকে রইল, যতক্ষণ না রোনি ২০২১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার শেষ দিনগুলোতে পরিবার তার পাশে ছিল এবং তার স্মৃতিকে সম্মান জানাতে তারা একসাথে সময় কাটিয়েছেন। রোনির মৃত্যুর পর রব ৭৭ বছর, ডিয়ান ৭৬ বছর বয়সে ছিলেন এবং তারা এখনো এই দীর্ঘ সময়ের সঙ্গীকে স্মরণ করে।
রব ও ডিয়ান বলছেন, রোনিকে স্বাগত জানানো তাদের জীবনে এক অমূল্য অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে। ছোট একটি দয়া, এক চিমটি সহানুভূতি, কীভাবে এক জীবনের পথ পরিবর্তন করতে পারে তা তারা নিজেরাই অনুভব করেছেন। তাদের গল্প স্থানীয় সমাজে সহানুভূতি ও মানবিকতার গুরুত্বকে পুনরায় জোর দেয়।
এই ঘটনা দেখায় যে, ক্রিসমাসের মতো উৎসবের সময়ে করা ছোটখাটো দয়া দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। রোনি লকউডের সঙ্গে দম্পতির সম্পর্ক কেবল একটি গৃহস্থালির গল্প নয়, বরং মানবিক সংবেদনশীলতা ও পারস্পরিক সহায়তার উদাহরণ। আজকের সমাজে, যেখানে অনেকেই একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি, এমন গল্পগুলো আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একসাথে থাকা এবং সাহায্য করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
রোনি ও পার্সনস দম্পতির গল্প স্থানীয় মিডিয়ায় আলোচিত হয়েছে এবং এটি বহু মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় যে, কোনো অচেনা ব্যক্তিকে স্বাগত জানানো কেবল তার জন্য নয়, স্বাগতকারী ব্যক্তির জন্যও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিকতা এনে দেয়। ভবিষ্যতে এই ধরনের মানবিক উদ্যোগ বাড়তে পারে, যদি সমাজের প্রতিটি সদস্য ছোটখাটো দয়ার মাধ্যমে একে অপরের পাশে দাঁড়ায়।



