লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বাণিগঞ্জ ইউনিয়নের চরমনসা গ্রাম শুটারগোপ্তা এলাকায় ১৯ ডিসেম্বর রাত ১১টার পর ঘরে অগ্নিকাণ্ডে তিন মেয়ে শোয়ায় থাকা অবস্থায় জ্বলে গিয়ে দুজনের মৃত্যু হয়। সাত বছর বয়সী ছোট মেয়ে আয়েশা আক্তার আগুনে পুড়ে মারা যায়, বড় মেয়ে সালমা আক্তার ছয় দিন আইসিইউতে চিকিৎসা শেষে মৃত্যুবরণ করে।
বেলাল হোসেন, ওই গ্রাম ও বিএনপি সহসাংগঠনিক সম্পাদক, জানান যে আগুনের সময় তিনি, স্ত্রী নাজমা বেগম, দুই ছেলে (চার বছর বয়সী নাজমুল ইসলাম ও চার মাসের নজরুল ইসলাম) এবং তিন মেয়ে ঘরে শুয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, দরজা বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগানো হয়েছে। দরজা খুলতে না পারায় তিনি টিনের বেড়া ভেঙে সন্তানদের বের করার চেষ্টা করেন, তবে ছোট মেয়েটিকে বাঁচাতে পারেননি।
বড় মেয়ে সালমা আক্তারও টিনের বেড়া ভেঙে বের হতে পারেনি। তিনি টিনের গঠন ভেঙে বের হওয়ার সময় গরম ধোঁয়া ও শিখা থেকে গুরুতর পোড়া পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ন্যাশনাল বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে ছয় দিন চিকিৎসার পর ২৪ ঘণ্টা আগে রাতের দিকে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
বেলাল হোসেনের মতে, ছোট মেয়ের দেহের অবস্থা দেখে তিনি কবরের দিকে গিয়েছিলেন, তবে বড় মেয়ের দেহ দেখার সুযোগ পাননি। তিনি জানান, “চোখ খুলে বাপরে দেখলে মেয়েটা একটু শান্তি পাবে” বলে বড় মেয়ের দেহ দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে পরের দিনই সালমার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ায় তিনি তা দেখতে পারেননি।
অগ্নিকাণ্ডের পর বেলাল হোসেন নিজেও হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি কয়েক দিন হাসপাতালে থাকেন এবং বুধবার বিকেলে হাসপাতালে থেকে ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসেন। তার স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে দুই ছোট ছেলেও কোনো শারীরিক আঘাতের খবর পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় পুলিশ ঘটনাস্থলে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দরজা বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগানোর অভিযোগে কোনো সন্দেহভাজন বা ঘটনার কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী কর্মকর্তারা নিরাপত্তা ক্যামেরা রেকর্ড, প্রতিবেশী ও পরিবারের বিবরণ সংগ্রহ করে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করছেন।
বেলাল হোসেনের পরিবারে এই দু’টি শোকের ঘটনা একসাথে ঘটায় পরিবারকে গভীর শোকের মধ্যে ফেলে। তিনি স্থানীয় সমাবেশে জানান, “মেয়েরা চিৎকার করে ‘আব্বু বাঁচাও’ বলছিল, আমি বলি ‘বাইরে হও’। দরজা না খুললে আমি টিনের বেড়া ভাঙতে বাধ্য হই। ছোট মেয়েটিকে বাঁচাতে পারিনি, বড় মেয়েরও শেষ দেখার সুযোগ পাইনি।”
বেলাল হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয় ও স্থানীয় নেতৃত্বের দায়িত্বের কারণে এই ঘটনা সমাজে ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ঘটনাটির সম্পূর্ণ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছে।
এই দুঃখজনক ঘটনার পর, স্থানীয় সমাজে নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বাড়ির দরজা, গ্যাস ও পেট্রল সংরক্ষণে সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এমন ধরনের দুঃখজনক ঘটনা রোধে স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।



