ঢাকা – বিশ্বব্যাংকের প্রাক্তন শীর্ষ অর্থনীতিবিদ জাহিদ হুসেইনের মতে, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বর্তমানে মাঝারি স্তরের স্ট্যাগফ্লেশনের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিডিপি বৃদ্ধির গতি ধীর, মুদ্রাস্ফীতি উচ্চ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সীমাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
স্ট্যাগফ্লেশন শব্দটি সাধারণত অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতির সমন্বয়কে নির্দেশ করে, তবে উন্নয়নশীল দেশে এটি অবশ্যই নেতিবাচক বৃদ্ধির অর্থ নয়। মূলত লক্ষ্য বা সম্ভাব্য বৃদ্ধির নিচে অর্থনীতি স্থির থাকলেও মুদ্রাস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, তখনই স্ট্যাগফ্লেশন বলা হয়।
কোভিড‑১৯ মহামারীর পর থেকে মুদ্রাস্ফীতি তীব্রভাবে বেড়েছে, আর জিডিপি বৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। যদিও মোট দেশীয় উৎপাদনের বৃদ্ধি এখনও ৩.৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে রয়ে গেছে, তবু উচ্চ একক অঙ্কের মুদ্রাস্ফীতি স্ট্যাগফ্লেশনীয় চাপের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের মূল ভিত্তি হিসেবে রাজনৈতিক ও মুদ্রা নীতি স্থিতিশীলতা উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নীতি পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে তুলতে বাধা সৃষ্টি করে।
ম্যাক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তিনটি মূল উপাদান অপরিহার্য: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, পেমেন্ট ব্যালেন্সের ভারসাম্য রক্ষা এবং আর্থিক খাতের স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার। এই তিনটি ক্ষেত্রের সুষ্ঠু পরিচালনা ছাড়া অর্থনীতির ধারাবাহিক বৃদ্ধি সম্ভব নয়।
বর্তমান প্রতিষ্ঠানগত কাঠামোর অধীনে বাংলাদেশের সম্ভাব্য বৃদ্ধির হার প্রায় ৬.৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ। এই সীমা অতিক্রম করে ৮ শতাংশের কাছাকাছি বৃদ্ধি অর্জন করতে হলে গভীর কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন, যা উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তনকে অন্তর্ভুক্ত করে।
আর্থিক খাতের দুর্বলতা প্রধানত উচ্চ নন‑পারফরমিং লোন (এনপিএল) স্তরের কারণে। তবে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এনপিএল হার তার সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে এবং ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই উন্নতি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণদানের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
দশক ২০৩৫ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধির মডেল গ্রহণ করা জরুরি। শ্রম বাজারে কাঠামোগত সংস্কার, বেতন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে হবে, শুধুমাত্র উপরের স্তরে ছিটিয়ে পড়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ফাহমিদা খাতুনের মতে, উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদে সীমাবদ্ধতা দ্রুত সমাধান না করা হলে দেশটি নিম্ন স্তরের অর্থনৈতিক সমতা অবস্থায় আটকে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি হ্রাস এবং বেকারত্বের হার বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে মাঝারি স্ট্যাগফ্লেশনের চ্যালেঞ্জের মুখে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, পেমেন্ট ব্যালেন্সের ভারসাম্য রক্ষা এবং আর্থিক খাতের স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাঠামোগত সংস্কার চালিয়ে গেলে ২০২৫‑এর পরবর্তী দশকে উচ্চতর বৃদ্ধির হার অর্জন সম্ভব হবে। তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শ্রম বাজারের অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি ছাড়া ট্রিলিয়ন ডলার লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় নীতি নির্ধারক, ব্যবসা সংস্থা এবং শ্রমিক গোষ্ঠীর সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমগ্র সমাজের জন্য টেকসই ও সমানভাবে ভাগ করা যায়।



