বহলুকা উপজেলায় ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে ২৭ বছর বয়সী দিপু চন্দ্র দাসকে গোষ্ঠীভুক্ত মানুষদের দ্বারা দাহ করা হয়। ঘটনাস্থলটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কাছাকাছি, যেখানে দিপুকে গাড়ি থেকে নামিয়ে গিয়ে আগুনে জ্বালানো হয়। দাহের পর দিপুর দেহের অবশিষ্টাংশ দ্রুতই মহাসড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে ঘটনাটির শোক ও নীরবতা এখনও স্থানীয় সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
দিপু দাসের পরিবার জানায়, তিনি একটি টেক্সটাইল ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন এবং তার ১৮ মাসের মেয়ে রয়েছে। ঘটনায় তার পিতা ও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, দিপুকে ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা তার চাকরি থেকে বরখাস্তের প্রক্রিয়া চালিয়ে দিচ্ছিল। বরখাস্তের নথি ফ্যাক্টরির ভিতরে প্রস্তুত করা হয়, আর একই সময়ে গলিতে গোষ্ঠীজনিত হিংসা বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা দিপুকে গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যা মানবিক দায়িত্বের অবহেলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্থানীয় পুলিশ গোষ্ঠীভুক্ত সাতজনকে গ্রেফতার করেছে এবং ফ্যাক্টরির ফ্লোর ইন-চার্জ ও কোয়ালিটি ইন-চার্জকেও আটক করেছে। গ্রেফতারের পর পুলিশ গোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধে হিংসা ও দাহ্য অপরাধের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি জানিয়েছে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB) গোষ্ঠীর দ্বারা দিপুর বিরুদ্ধে আনা ধর্মভ্রষ্টতার অভিযোগকে “অত্যন্ত অস্পষ্ট” বলে মন্তব্য করেছে। তদন্তে কোনো সরাসরি সাক্ষী পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগের ভিত্তি কেবল গুজব ও গুজবের ওপর ভিত্তি করে। দিপুর পিতা, যিনি ১৮ মাসের মেয়ের একক পিতা, গুজবের ভিত্তিতে দিপুকে দাহ্য করার সিদ্ধান্তে গোষ্ঠীকে সমর্থন করতে বাধ্য হয়েছিল।
দিপুর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে গোষ্ঠী ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জুলাই মাস থেকে বিভিন্ন স্থানে গোষ্ঠী ন্যায়বিচার ঘটেছে, যার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং পুলিশ স্টেশন অন্তর্ভুক্ত। কিছু ক্ষেত্রে সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর হস্তক্ষেপে শিকারদের রক্ষা করা হয়েছে, তবে দিপুর ক্ষেত্রে কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি।
অধিক তদন্তে জানা যায়, গোষ্ঠী ন্যায়বিচার ঘটনার মূল কারণ হল ধর্মভ্রষ্টতার গুজব এবং সামাজিক মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ভয়। দিপুর ক্ষেত্রে, গুজবের ভিত্তিতে গোষ্ঠী তার ওপর আক্রমণ চালায়, যা শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, গোষ্ঠীভুক্ত সাতজনের পাশাপাশি ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। তবে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, গোষ্ঠী ন্যায়বিচারকে সমর্থনকারী সামাজিক পরিবেশ ও অবহেলা দূর না করা পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
বহলুকা থানার প্রধান কর্মকর্তার মতে, তদন্ত চলমান এবং সব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া, স্থানীয় প্রশাসন গোষ্ঠী ন্যায়বিচার রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে।
দিপু চন্দ্র দাসের পরিবার ও স্থানীয় সমাজের জন্য এই ঘটনা একটি গভীর শোকের মুহূর্ত, যা মানবিক মূল্যবোধ ও আইনি শৃঙ্খলার গুরুত্বকে পুনরায় তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে গোষ্ঠী ন্যায়বিচার রোধে যথাযথ আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন।



