ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি) বুধবার ‘নিকোটিন পাউচ ও ই-সিগারেট: বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও করণী’ শীর্ষক একটি সেমিনার আয়োজন করে। সেমিনারে দেশব্যাপী ই-সিগারেটের অবৈধ প্রবেশ ও নিকোটিন পাউচ উৎপাদন কারখানা অনুমোদনের ঝুঁকি নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।
টিসিআরসি সম্প্রতি পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, আটটি বিভাগীয় শহরের ৩৬০টি এলাকায় মোট ৩২৬টি দোকানে ই-সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। এদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই ঢাকায় অবস্থিত, যা দেশের ই-সিগারেট বাজারের কেন্দ্রীয়তা স্পষ্ট করে। গবেষণার ফলাফল সেমিনারে উপস্থাপন করা হয় এবং বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে তীব্র উদ্বেগের সাড়া পাওয়া যায়।
গবেষণা থেকে প্রকাশ পায়, ঢাকার মধ্যে ই-সিগারেটের জন্য বিশেষায়িত দোকান সংখ্যা ১৩৫টি, যেখানে শুধুমাত্র ই-সিগারেট ও সংশ্লিষ্ট ডিভাইস বিক্রি হয়। অন্যদিকে, রাজধানীর বাইরে এই ধরণের বিশেষ দোকান মাত্র ১৯টি, যা মোটের প্রায় ৬ শতাংশ। বিশেষায়িত দোকানের পাশাপাশি, ঘড়ি, চশমা, বেল্ট, মানিব্যাগ, কসমেটিকস এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক পণ্যের দোকানেও ই-সিগারেট পাওয়া যায়।
ঢাকার বাইরে এই ধরনের বহুমুখী দোকানে ই-সিগারেটের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম; মোট ৫৭টি দোকানে বিক্রি হয়, যা অন্যান্য দোকানের প্রায় ১৯ শতাংশ। চট্টগ্রামে কিছুটা বেশি উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, যেখানে ৩০টি দোকানে ই-সিগারেট বিক্রি হয়। বাকি পাঁচটি বিভাগে এই পণ্যের বিক্রির সংখ্যা অল্প।
ই-সিগারেটের অবৈধ আমদানি ও বিক্রির ব্যাপকতা সত্ত্বেও, সরকার ই-সিগারেট ও ভেপের আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। তবে বাজারে এই পণ্যের প্রবেশ অব্যাহত থাকায় জনস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, নিকোটিন পাউচের উৎপাদন কারখানা অনুমোদন তামাকের আসক্তি, মৃত্যুর হার এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়াতে পারে।
সেমিনারের প্রধান অতিথি ছিলেন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার সভাপতি অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী। তামাক নিয়ন্ত্রণের বিশারদ হেলাল আহমেদ সভার সভাপতিত্ব করেন। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মো. শফিকুল ইসলাম, আইনজীবী ও নীতি বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, গবেষক আমিনুল ইসলাম বকুল এবং ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ। টিসিআরসি’র প্রকল্প পরিচালক মো. বজলুর রহমান সেশনটি পরিচালনা করেন, আর প্রকল্প কর্মকর্তা মো. জুলহাস আহমেদ মূল গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন।
প্রেজেন্টেশনে জুলহাস আহমেদ উল্লেখ করেন, ই-সিগারেটের বাজারের অধিকাংশ কার্যক্রম ঢাকায় কেন্দ্রীভূত, যা নিয়ন্ত্রক নীতি প্রয়োগে বিশেষ চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। তিনি বলেন, বিশেষায়িত দোকানের পাশাপাশি সাধারণ রিটেল শপে বিক্রির বিস্তার নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা নিকোটিন পাউচের কারখানা অনুমোদন বাতিল, ই-সিগারেটের অবৈধ আমদানি ও বিপণন বন্ধের জন্য তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে থাকেন। তারা জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের সুরক্ষার জন্য কঠোর নিয়মাবলী প্রয়োগ করা অপরিহার্য।
সেমিনারের শেষে অংশগ্রহণকারীরা প্রশ্নোত্তর সেশনে ই-সিগারেটের স্বাস্থ্যগত প্রভাব, নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা এবং নিকোটিন পাউচের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন। অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী একমত হন যে, বর্তমান নীতি কাঠামোতে ঘাটতি রয়েছে এবং তা দ্রুত সংশোধন করা দরকার।
এই আলোচনার পর, টিসিআরসি এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সংস্থা একত্রে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করার পরিকল্পনা জানিয়েছে। পরিকল্পনায় ই-সিগারেটের বাজার পর্যবেক্ষণ, অবৈধ আমদানি রোধে শুল্ক ও নজরদারি বাড়ানো এবং নিকোটিন পাউচের উৎপাদন অনুমোদন পুনর্বিবেচনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ও তামাক নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিকোণ থেকে, ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচের ব্যাপকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই পণ্যগুলো তামাকের বিকল্প হিসেবে না থেকে, নতুন আসক্তির সূত্রপাত করতে পারে।
অবশেষে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জনগণকে সচেতনতা বৃদ্ধি, তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেটের ব্যবহার কমাতে এবং নিকোটিন পাউচের উৎপাদন ও বিক্রয়ের ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে আহ্বান জানান। ভবিষ্যতে এই পদক্ষেপগুলো কার্যকর হলে, তামাক-সম্পর্কিত রোগ ও মৃত্যুর হার কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।



