সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছর পর, মিয়ানমারে রবিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ভোটাররা নির্বাচনী ব্যালটে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে চিহ্নিত করবে, যা দেশের ভবিষ্যৎ শাসন কাঠামো নির্ধারণের লক্ষ্য রাখে।
সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং গত সপ্তাহে একটি সামরিক ঘাঁটিতে ঘোষণা করেন, রবিবারের সাধারণ নির্বাচনে নাগরিকরা স্বাধীনভাবে প্রার্থী নির্বাচন করতে পারবেন। তিনি এই ঘোষণাকে দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা হিসেবে উপস্থাপন করেন।
রাষ্ট্র পরিচালিত সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়, হ্লাইং ভোটারদের এমন প্রার্থী বেছে নিতে পরামর্শ দেন, যারা তাতমাদওয়ের (সামরিক বাহিনী) সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে সক্ষম। এই নির্দেশনা ভোটের ফলাফলে সামরিকের প্রভাব বাড়ানোর উদ্দেশ্য নির্দেশ করে।
রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই মন্তব্যগুলো সামরিক শাসনের ক্ষমতা সংরক্ষণে একটি কৌশল হিসেবে দেখা যায়। নির্বাচনের মাধ্যমে সামরিকের সরাসরি শাসন ছাড়াই রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের চেষ্টা স্পষ্ট।
বিশ্লেষক ও কূটনীতিকরা একমত যে, মিয়ানমারের স্থিতিশীল প্রশাসন গড়ে তোলাই প্রধান লক্ষ্য। তবে দেশের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ এবং বেসামরিক জনগণের দুর্ভোগের কারণে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বহিরাগত সমর্থনও সীমিত, কারণ সামরিক শাসনকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ দেশ স্বীকৃতি দেয় না। ফলে, সামরিক সরকার বিদেশি সাহায্য বা স্বীকৃতি পেতে সংগ্রাম করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সি উল্লেখ করেন, পরোক্ষ সামরিক শাসন পুনরাবৃত্তি কোনো সশস্ত্র সংঘাত বা নাগরিক প্রতিরোধের সমাধান নয় এবং দেশের সংকট অব্যাহত থাকবে। তার মতে, বাস্তবিক পরিবর্তন ছাড়া পরিস্থিতি উন্নত হবে না।
মিয়ানমারের ৩৩০টি শহর-গ্রাম থেকে মাত্র ২০২টি এলাকায় রবিবার এবং ১১ জানুয়ারি দুই ধাপে ভোটগ্রহণ হবে। এই দুই ধাপের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সামরিকের বিভিন্ন স্তরের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে।
সেনাবাহিনীর প্রভাব ভোটার তালিকা, ভোটপত্র বিতরণ এবং গণনার সব ধাপে স্পষ্ট। নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের সীমিত প্রবেশাধিকার রয়েছে, যা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে।
মিয়ানমার বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাথিসন বলেন, সামরিক কোনো এমন পরিবর্তন অনুমোদন করবে না, যা তাদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলবে। তাই নির্বাচনের ফলাফল সামরিকের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
সু চি ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ২০২০ ও ২০১৫ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল, তবে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর নির্বাচন কমিশন দলটিকে বিলুপ্ত করে দেয়। ফলে, এনএলডি এখন রাজনৈতিক মঞ্চে উপস্থিত নয়।
অনেক বিরোধী দল এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নির্বাচনী প্রতিযোগিতার পরিসর সংকুচিত করেছে। শুধুমাত্র ছয়টি দলই দেশব্যাপী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
সেই ছয়টি দলের মধ্যে সামরিক-সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দাখিল করেছে এবং জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা সর্বোচ্চ। এই পরিস্থিতি সামরিকের জন্য বেসামরিক শাসকের ভূমিকা তৈরি করার সুযোগ সৃষ্টি করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাই কি জিন সো উল্লেখ করেন, ইউএসডিপি ইতিমধ্যে তার কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক নেতাদের স্থাপন করেছে এবং ভবিষ্যতে একটি জাতীয় নেতা উত্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই নেতৃত্বের উদ্ভব সামরিকের স্বার্থে কাজ করতে পারে বলে তিনি অনুমান করেন।
সামগ্রিকভাবে, রবিবারের নির্বাচন মিয়ানমারের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে পুনর্গঠন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তবে ভোট প্রক্রিয়ার সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং সীমিত প্রতিপক্ষের উপস্থিতি ফলাফলকে পূর্বানুমানযোগ্য করে তুলেছে। ভবিষ্যতে নির্বাচনের পরবর্তী ধাপগুলো দেশীয় শান্তি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল হবে।



