ঢাকায় শিবাগে বুধবার গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, জুলাই চুক্তি স্বাক্ষরের পর “সভ্যতা” নিয়ে মুহাম্মদ ইউনুসের পূর্ববর্তী মন্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হিংসা ও অগ্নিকাণ্ডের পর এই দাবিকে পুনর্বিবেচনা করা দরকার। সমাবেশে তিনি নিজে সভাপতিত্ব করে বিভিন্ন বামগোষ্ঠীর সঙ্গে একত্রে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “মাসের পর মাসের নৃশংসতা, বিশেষ করে ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বরের ঘটনা, কি সত্যিই সভ্যতার উদাহরণ হতে পারে?”।
অনেকের জন্য এই প্রশ্নের পটভূমি হল গত ১৭ অক্টোবর জুলাই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ইউনুসের ভাষণ, যেখানে তিনি বলেছিলেন, “আমরা এক বর্বর জগতে ছিলাম, এখন আমরা সভ্যতায় পৌঁছেছি”। সেই বক্তব্যের পরই শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সভ্যতার সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী আক্রমণের পর তিনি আবার এই বিষয়টি উত্থাপন করেন, এবং এটিকে কেবল হঠাৎ উচ্ছৃঙ্খল আচরণ নয়, বরং পরিকল্পিত মতাদর্শিক সন্ত্রাসের অংশ বলে ব্যাখ্যা করেন।
গত বৃহস্পতিবার রাতের দিকে ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোের কার্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলা ঘটে। গুলিবিদ্ধ ও ধ্বংসের পর, দহনের মাধ্যমে ভবনটি পুড়িয়ে দেয়া হয়। একই রাতে ডেইলি স্টার এবং ধানমন্ডির ছায়ানট ভবনেও অনুরূপ আক্রমণ চালানো হয়। পরের দিন তোপখানা সড়কে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এই ধারাবাহিক আক্রমণগুলো মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক সংস্থাকে লক্ষ্য করে, যা দেশের মুক্তমত প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
আনু মুহাম্মদ বলেন, এই ধরনের হিংসা “অবিশ্বাস্য” এবং “পরিকল্পিত সন্ত্রাস” হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, গত দেড় দশকে স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি এবং নির্বাচন সংক্রান্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি ধারাবাহিকভাবে কণ্ঠ তুলেছেন। তিনি আরও বলেন, নূরুল কবীরের ওপর আওয়ামী লীগের সমর্থকরা আক্রমণ চালিয়েছেন, যা রাজনৈতিক বিরোধের নতুন মাত্রা প্রকাশ করে।
মিডিয়া সংস্থাগুলোর ওপর আক্রমণকে তিনি “উদ্দেশ্যহীন তরুণদের হঠাৎ উচ্ছৃঙ্খলতা” নয়, বরং “একটি সুসংগঠিত সন্ত্রাসী পরিকল্পনা” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই হামলাগুলো দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর আক্রমণ এবং স্বাধীন প্রকাশের স্বাধীনতাকে হুমকি দেয়।
সমাবেশে উপস্থিত বামগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা আনু মুহাম্মদের সঙ্গে একমত হয়ে দাবি করেন, সরকারকে এই সন্ত্রাসী আক্রমণগুলো দ্রুত তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের আইনি দায়িত্বে টানা উচিত। তারা এছাড়াও দাবি করেন, মিডিয়া ও শিল্পী সংস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হয়।
শহরের বিভিন্ন কোণে নিরাপত্তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে, সমাবেশের অংশগ্রহণকারীরা সরকারকে মানবাধিকার রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে বলছেন। তারা উল্লেখ করেন, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং স্বাধীন শিল্পী গোষ্ঠী দেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য, এবং তাদের ওপর আক্রমণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অধিকন্তু, আনু মুহাম্মদ উল্লেখ করেন, জুলাই চুক্তি পর “সভ্যতা”র ধারণা যদি বাস্তবায়িত না হয়, তবে তা কেবল শব্দের খেলা রয়ে যাবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকার কি সত্যিকারের সভ্যতা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও সামাজিক কাঠামো তৈরি করেছে, নাকি কেবল রূপকথা রচনা করছে।
এই সমাবেশের পর, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, সরকার যদি এই আক্রমণগুলোর দায়িত্ব স্বীকার না করে এবং যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়, তবে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও অস্থির হতে পারে। মিডিয়া সংস্থাগুলোতে আত্মবিশ্বাসের হ্রাস এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে, যা স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার ওপর প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, সরকারী পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা আশা করছেন, সরকার দ্রুত তদন্তের আদেশ জারি করবে এবং সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিদের আইনি দায়িত্বে টানবে। এ ধরনের পদক্ষেপ না নিলে, দেশের আন্তর্জাতিক চিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনা বাড়তে পারে।
সামগ্রিকভাবে, শিবাগে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশ এবং আনু মুহাম্মদের বক্তৃতা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক সংস্থার নিরাপত্তা, মানবাধিকার রক্ষা এবং সত্যিকারের সভ্যতা গঠনের জন্য সরকারের দায়িত্বের ওপর নতুন আলো ফেলেছে। ভবিষ্যতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



