২৪ ডিসেম্বর বুধবার বিকেলে ফেনি শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে শোক ও সংহতি সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ তার বক্তব্য রাখেন। সমাবেশটি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির হত্যার প্রতিবাদে আয়োজন করা হয়েছিল।
হাসনাত আবদুল্লাহ উল্লেখ করেন, “আমরা চেয়েছি একটা ব্যালট‑বিপ্লব। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, কতিপয় রাজনৈতিক দল তাদের মার্কা বিলুপ্ত করে দিয়ে অন্য একটা দলে একীভূত হচ্ছে। যারা এক‑দুটি সিটের জন্য দলকে বিক্রি করে দিচ্ছেন, তারা নিজেদের দলের প্রতি অন্যায় করেছেন।” তিনি এ কথায় বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে দল‑দল বদল ও স্বার্থপরতার দিকে ইঙ্গিত করেন।
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা চেয়েছি জুলাই বিপ্লব, কিন্তু কতিপয় রাজনৈতিক দল বুলেট‑বিপ্লবের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের সবাইকে একসঙ্গে অন্যায়ের বিপক্ষে, ইনসাফের পক্ষে লড়ে যেতে হবে। হাদি ভাই আমাদের শিখিয়েছেন, আমরা জান দেব কিন্তু জুলাই দেব না।” এখানে তিনি ‘জুলাই বিপ্লব’ শব্দটি ব্যবহার করে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছেন, আর ‘বুলেট‑বিপ্লব’কে সমালোচনা করছেন।
সমাবেশের প্রধান অতিথি ছিলেন গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটের শীর্ষ নেতা ও এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি সংক্ষিপ্তভাবে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, “ন্যায়, ইনসাফ ও গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করতে যত ভয়ভীতিই দেখানো হোক না কেন, সন্ত্রাসবাদ ও আধিপত্যবাদের কাছে বাংলাদেশ আগেও কখনো মাথা নত করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। যারা ১৫ বছর জুলুমতন্ত্র চালিয়েছে, তাদের পালাতে ১৫ মিনিটও লাগেনি। ভবিষ্যতে যারা জনগণকে জিম্মি করতে চাইবে, তারাও জনরোষে পালাতে বাধ্য হবে।” মঞ্জু দেশের স্বতন্ত্রতা ও গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি অটল থাকার ওপর জোর দেন।
শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির হত্যার পর এই সমাবেশে উপস্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা একসঙ্গে শোক প্রকাশের পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা।
হাসনাতের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তিনি ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন, তবে কিছু দলকে ‘বুলেট‑বিপ্লব’ের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থপরতা ও স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যকে ‘দলকে বিক্রি করা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, যা তিনি দলের নীতি ও আদর্শের প্রতি অবমাননা হিসেবে দেখেন।
মঞ্জুর বক্তব্যে দেশের ইতিহাসে সন্ত্রাসবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি অতীতের জুলুমতন্ত্রের পতনকে উদাহরণ দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতে যে কোনো স্বৈরাচারী চেষ্টাকে জনমত ও গণতান্ত্রিক শক্তি থামাতে পারবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন।
শোক সমাবেশের শেষে উপস্থিত সকল অংশগ্রহণকারী একসঙ্গে শোকের গান গেয়ে, শিকারের পরিবারকে সমর্থন জানিয়ে এবং ভবিষ্যতে দেশের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার রক্ষার জন্য একত্রে কাজ করার প্রতিজ্ঞা করেন। এই ধরনের সমাবেশ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা ও সমন্বয়ের একটি মঞ্চ হিসেবে কাজ করে, যা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশকে স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ।
হাসনাতের ‘ব্যালট‑বিপ্লব’ ও ‘বুলেট‑বিপ্লব’ সম্পর্কিত মন্তব্য এবং মঞ্জুর ‘ন্যায়‑ইনসাফ‑গণতন্ত্র’ের ওপর জোর দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের সমাবেশ ও বক্তৃতা দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার ইচ্ছা ও স্বৈরাচারী চেষ্টার বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে।
এই সমাবেশের মূল বার্তা স্পষ্ট: গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্মান করা, স্বার্থপরতা ও স্বল্পমেয়াদী স্বার্থের বদলে দেশের দীর্ঘমেয়াদী মঙ্গলের জন্য একসঙ্গে কাজ করা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই ধরনের সংলাপ ও সমন্বয় দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



