মিয়ানমার ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রকে আরও জটিল করে তুলছে। সামরিক জুন্তা কর্তৃক পরিচালিত এই ভোটের উদ্দেশ্য হল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈধতা অর্জন, যদিও দেশের অধিকাংশ অঞ্চল এখনো কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে বসবাসকারী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিরোধী শক্তিগুলি স্বতন্ত্র প্রশাসন, কর সংগ্রহ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেছে। চীনের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলি কিছু এলাকায় সামরিক সংঘর্ষ কমিয়েছে, তবে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটায়নি; বরং বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা নির্বাচনের প্রকৃত কার্যকারিতা সীমিত করে।
এই ভাঙা কাঠামোর মধ্যে নির্বাচন মূলত একটি পারফরম্যান্সে রূপান্তরিত হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার সরঞ্জাম নয়। জাতিগত গোষ্ঠীগুলি নিজেদের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলকে বজায় রাখতে ভোটকে অগ্রাহ্য করে, ফলে কেন্দ্রীয় সরকার শুধুমাত্র সীমিত এলাকায়ই ভোটের ফলাফল প্রয়োগ করতে পারবে। এই পরিস্থিতি পূর্বে শ্রীলঙ্কা ও লেবাননের মতো দেশগুলিতে দেখা গিয়েছে, যেখানে জাতিগত বিভাজন নির্বাচনের বৈধতাকে ক্ষুণ্ণ করেছে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য এই নির্বাচন কোনো বাস্তবিক স্বীকৃতি, অধিকার বা নিরাপত্তা প্রদান করে না। ২০১৭ সালের গৃহযুদ্ধের সময় প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে প্রবেশের পর থেকে তাদের রাজনৈতিক অবস্থা অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। বর্তমান নির্বাচনী কাঠামোও এই বহিষ্কারের ধারাকে বজায় রাখে; জুন্তা বা বিরোধী কোনো বড় রাজনৈতিক দল রোহিঙ্গাদের জাতীয় জীবনে পুনঃসংযোজনের কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি। সিভিল ওয়ারের অব্যাহততা তাদের সমস্যাকে রাজনৈতিক আলোচনার প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে, ফলে নাগরিকত্ব ও দায়িত্বের প্রশ্নগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত হয়।
বাংলাদেশের জন্য এই রাজনৈতিক শূন্যতা তাত্ক্ষণিক প্রভাব ফেলছে। মিয়ানমারের অব্যাহত অস্থিরতা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে, ফলে কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। শরণার্থী সম্প্রদায়ের ওপর আর্থিক ও সেবার বোঝা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দু’দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো পুনর্বাসনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার দাবি করে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বাস্তবায়ন কঠিন।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, “মিয়ানমারের নির্বাচন কেবলমাত্র জুন্তার জন্য বৈধতা অর্জনের উপায় নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর জন্যও একটি কৌশলগত সুযোগ, যা সীমান্তে তাদের প্রভাব বাড়াতে পারে।” চীনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চীন-মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থিত জোট ও বাণিজ্যিক পথগুলো এই রাজনৈতিক অস্থিরতাকে ব্যবহার করে তাদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে। একই সময়ে, ভারত ও থাইল্যান্ডের কূটনৈতিক নীতি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সমাধানে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, যদিও তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থও বিবেচনা করা হচ্ছে।
আসন্ন মাসগুলোতে মিয়ানমারের নির্বাচনের ফলাফল কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে জাতিগত গোষ্ঠী ও বিরোধী বাহিনীর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সমঝোতার উপর। যদি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলগুলো ভোটের ফলাফলকে স্বীকৃতি না দেয়, তবে দেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠন দীর্ঘমেয়াদে স্থবির থাকবে। একই সঙ্গে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত চাপ এবং দু’দেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে মানবিক সংকটের সমাধান সম্ভব হয়।
মিয়ানমারের নির্বাচন, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তবু দেশের বিভক্ত কাঠামো ও মানবিক সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তা কেবলমাত্র একটি রূপকল্পই রয়ে যাবে। এই পরিস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক নীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে, যা পরবর্তী মাসে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে থাকবে।



