বুর্কিনা ফাসোর অস্থায়ী নেতা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে মঙ্গলবার সেহেল স্টেটস অ্যালায়েন্স (AES) এর শীর্ষ সম্মেলনের সমাপ্তি পরেই বৃহৎ সমন্বিত সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা জানিয়ে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তীব্রতর করার সংকেত দিয়েছেন। ত্রাওরের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে অ্যালায়েন্সের সদস্য দেশগুলো—বুর্কিনা ফাসো, মালি ও নাইজার—একসাথে অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে “বৃহৎ পরিসরের” অপারেশন চালাবে।
এই শীর্ষ সম্মেলনটি মঙ্গলবার শেষ হয়, যেখানে তিনটি দেশের সামরিক শাসকরা একত্রে ২০২৪ সালে গঠিত AES এর কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য নতুন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। সম্মেলনের সময় ৫,০০০ সৈন্যের সমন্বিত ইউনিফাইড ফোর্স (FU‑AES) চালু করা হয়, যা আল-কায়েদা ও আইএসআইএল (ইসিস) সংযুক্ত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য গঠন করা হয়েছে।
AES এর নতুন প্রধান হিসেবে ত্রাওরে কোনো নির্দিষ্ট অপারেশনাল পরিকল্পনা প্রকাশ না করলেও, তিনি উল্লেখ করেন যে এই যৌথ পদক্ষেপগুলো অঞ্চলীয় নিরাপত্তা সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ হবে। ত্রাওরের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বুর্কিনা ফাসো, মালি ও নাইজার প্রত্যেকেই সামরিক অভ্যুত্থানের পরপরই ECOWAS থেকে বেরিয়ে এসে AES গঠন করেছে, যা তাদের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার উদ্দেশ্যকে জোরদার করে।
নাইজারের সামরিক সরকার প্রধান জেনারেল ওমর তচিয়ানি সম্মেলনে বলেন, AES “আমাদের দেশগুলোতে সবধরনের দখলকারী বাহিনীর শেষ করে দিয়েছে” এবং আর কোনো বিদেশি স্বার্থ আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারবে না। তচিয়ানি এই বক্তব্যে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের প্রতি দেশীয় বিরোধিতা তুলে ধরেন।
বুর্কিনা ফাসোর ত্রাওরে পশ্চিম আফ্রিকায় সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করে, তাকে “ব্ল্যাক উইন্টার” নামে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই সময়ে বাহ্যিক হুমকি, সহিংসতা ও অর্থনৈতিক চাপে সেহেলীয় স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই সমন্বিত প্রতিক্রিয়া জরুরি।
সম্মেলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ফলাফল ছিল AES টেলিভিশনের সূচনা, যা তিন দেশের সরকার যৌথভাবে পরিচালনা করবে। মালির প্রেসিডেন্ট জেনারেল আস্সিমি গয়তা এই চ্যানেলকে “ভ্রান্ত তথ্য ও শত্রুতাপূর্ণ বর্ণনা ভাঙার কৌশলগত সরঞ্জাম” হিসেবে বর্ণনা করেন। গয়তা বলেন, এই মাধ্যমে জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং বিদেশি প্রচারণা প্রতিহত করা সম্ভব হবে।
সামরিক ক্ষেত্রে গয়তা জানান, সাম্প্রতিক অপারেশনে “একাধিক সন্ত্রাসী ঘাঁটি” ধ্বংস করা হয়েছে এবং তা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করেছে। তিনি এই সাফল্যকে AES এর সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করেন।
অর্থনৈতিক দিক থেকে গয়তা আন্তর্জাতিক বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, AES এর সদস্য দেশগুলো তাদের স্বার্থের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক নীতি গঠন করবে এবং বহিরাগত চাপের মুখে নিজেদের স্বনির্ভরতা বজায় রাখবে।
বুর্কিনা ফাসো, মালি ও নাইজার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব থেকে সরে এসে রাশিয়াকে নতুন মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে। সমালোচকরা এই পরিবর্তনকে আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা ও রাশিয়ার প্রভাব বাড়ার ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন, তবে AES এর নেতারা এটিকে আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছেন।
অবশ্যই, এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করছেন যে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফলে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক নীতির অবহেলা হতে পারে, আর অন্যদিকে AES সদস্য দেশগুলো দাবি করে যে তারা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য স্বতন্ত্র পথ বেছে নিয়েছে।
ভবিষ্যতে AES এর যৌথ সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম কীভাবে বিকশিত হবে, তা পুরো সেহেল অঞ্চলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা গতিপথকে প্রভাবিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ত্রাওরের ঘোষিত “বৃহৎ পরিসরের” অপারেশন যদি সফল হয়, তবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম দমন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সমর্থন হ্রাস ও রাশিয়ার প্রভাব বাড়ার ফলে অঞ্চলীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে।
সামগ্রিকভাবে, AES এর গঠন ও সামরিক সমন্বয় সেহেল অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন মোড় আনছে, যা দেশীয় স্বায়ত্তশাসন রক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এই পরিবর্তনগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী হবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে।



