বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিস বুধবার ১৫ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার (প্রায় ১৫০.৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) অতিরিক্ত তহবিল অনুমোদন করেছে, যা দেশের নিম্নআয়ের তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টি করবে। এই তহবিল ‘রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অফ ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট’ (RAISE) প্রকল্পের আওতায় প্রদান করা হবে এবং বিশেষভাবে নারী ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
RAISE প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা, যা দেশের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৮০ শতাংশ গঠন করে। পূর্বে নির্ধারিত ২,৩৩,০০০ সুবিধাভোগীর পাশাপাশি অতিরিক্ত ১,৭৬,০০০ তরুণকে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে, ফলে মোট প্রায় ৪,০৯,০০০ যুবক-যুবতী এই উদ্যোগের সুবিধা পাবে।
প্রকল্পের অধীনে অংশগ্রহণকারীরা দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ প্রোগ্রাম, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মশালা এবং ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা পাবে। এসব সেবা তাদের ব্যবসায়িক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে এবং কর্মসংস্থান বাধা দূর করতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য মানসম্মত শিশু যত্ন কেন্দ্র (চাইল্ড কেয়ার) স্থাপন এবং জলবায়ু সহনশীল জীবিকা বিকাশে জোর দেওয়া হবে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিরেক্টর গিল মার্টিন উল্লেখ করেছেন, একটি স্থিতিশীল চাকরি পরিবার ও সমাজের গঠন পরিবর্তন করতে পারে। তিনি বলেন, প্রতি বছর বহু তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও যথাযথ কাজ পায় না, এবং এই অতিরিক্ত তহবিল নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর তরুণ, বিশেষ করে নারীদের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা ও সম্পদ অর্জনে সহায়তা করবে।
প্রকল্পের টিম লিডার অনিকা রহমানের মতে, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে। নতুন তহবিলের মাধ্যমে মানসম্মত শিশু যত্নের মতো উদ্ভাবনী সমাধান যুক্ত করা হয়েছে, যা নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
RAISE প্রকল্পের কার্যক্রম শহরের বাইরে গ্রামীণ এলাকায়ও বিস্তৃত হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্পন্ন শিশু যত্ন সেবা চালু করার লক্ষ্যে নারীদের প্রশিক্ষণ ও স্টার্ট‑আপ অনুদান প্রদান করা হবে। এই উদ্যোগের ফলে নারীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে এবং শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া, নিয়োগকর্তা ও চাকরিপ্রার্থীর সংযোগ বাড়াতে জব ফেয়ার এবং ক্যারিয়ার মেলা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি ২০২১ সালে চালু হওয়ার পর থেকে ইতিবাচক ফলাফল দেখিয়েছে। প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা গ্রহণকারী তরুণদের মধ্যে ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যা দেশের লিঙ্গ সমতা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সরাসরি স্থানীয় উৎপাদন ও ভোগ্য পণ্যের চাহিদা বাড়াবে। ক্ষুদ্রঋণ ও প্রশিক্ষণ সেবা প্রদানকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন গ্রাহক ভিত্তি গড়ে উঠবে, ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে। একই সঙ্গে, মানসম্মত শিশু যত্ন সেবার চাহিদা বৃদ্ধির ফলে সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও সরবরাহ চেইনেও নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে কিছু ঝুঁকি অবশিষ্ট রয়েছে। প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের গুণমান, ঋণ পুনরুদ্ধার হার এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদা সঠিকভাবে অনুমান করার ওপর। এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে কিছু অঞ্চলে কৃষি ভিত্তিক জীবিকা ঝুঁকির মুখে থাকতে পারে, যা অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন করবে।
সারসংক্ষেপে, বিশ্বব্যাংকের এই অতিরিক্ত তহবিল যুব কর্মসংস্থান ও নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের উন্নয়ন, মানসম্মত শিশু যত্ন সেবা এবং জলবায়ু সহনশীল জীবিকার ওপর জোর দিয়ে প্রকল্পটি অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যকে সমর্থন করবে। ভবিষ্যতে এই উদ্যোগের বিস্তৃতি ও প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে নীতি নির্ধারক ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের জন্য আরও কার্যকর কৌশল গড়ে তোলা সম্ভব হবে।



