উত্তরায় সানবিমস স্কুলের শিক্ষক আজিজুল ইসলাম ২৪ ডিসেম্বর শ্রীবাজারের মোহাম্মদপুরে অবস্থিত তার ফ্ল্যাটে ঘটিত দু’জনের হিংসাত্মক হত্যাকাণ্ডের শোকঘোড়া বয়ে নিচ্ছেন। তার স্ত্রী ও কন্যা দুজনই রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে কন্যাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
আজিজুলের মতে, ঘটনাটি ঘটার দিন তিনি সকালবেলা স্কুলে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে গিয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে তিনি স্ত্রীর রক্তাক্ত দেহ এবং কন্যার দেহে গাঢ় রক্তের দাগ দেখতে পান। কন্যার দেহে তাপমাত্রা এখনও উঁচু থাকায় তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকগণ কন্যার দেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন লক্ষ্য করেন এবং তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরবর্তী তদন্তে জানা যায়, স্ত্রীর গলায় ছয়টি আঘাতের চিহ্ন এবং কন্যার দেহে ত্রিশের বেশি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মৃতদেহের ওপর ফরেনসিক পরীক্ষা চালিয়ে প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত নিরাপত্তা ক্যামেরার রেকর্ড এবং প্রতিবেশীর বিবৃতি অনুসারে, হত্যাকারী বা হত্যাকারীদের পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
আজিজুলের ছোট বোন জুবাইদা গুলশান আরা ১৮ ডিসেম্বর পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ঘটনাটির বিশদ বর্ণনা করেন। তার সঙ্গে বড় বোন আনজুমান আরা ও ভাগনি নূরেম মাহপারা উপস্থিত ছিলেন। পরিবারগত সভায় সবাই একমত হন যে, দায়ী ব্যক্তিদের উদাহরণস্বরূপ কঠোর শাস্তি দেওয়া উচিত।
আজিজুলের বিবরণে প্রকাশ পায় যে, তিনি ও তার স্ত্রী ২০০৮ সালে বয়সের কিছুটা বেশি বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি প্রায়ই প্রকাশ্যে তার স্ত্রীর নাম “নীনা বউ” বলে ডেকেছিলেন এবং সকালে বের হওয়ার সময় দুজনের হাত ধরা এবং মাথায় আলতো করে চুমু দেওয়া তার রুটিনের অংশ ছিল। তবে, এই শেষ বিদায়ের মুহূর্তটি কখনোই কল্পনা করা যায়নি।
দম্পতি ২০১২ সাল থেকে একই ফ্ল্যাটে বসবাস করছিলেন। বাড়ির কাজের বেশিরভাগই স্ত্রীর দায়িত্ব ছিল; তিনি নিজে ঘর পরিষ্কার করতেন এবং মাঝে মাঝে অল্প সময়ের জন্য গৃহকর্মী নিয়োগ করতেন। নিরাপত্তা প্রহরীর কাজের জন্য গৃহকর্মী প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছিল, তবে তা কখনো পূরণ হয়নি।
আজিজুলের পরিবারে কোনো শত্রুতা বা বিরোধের কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। তিনি উল্লেখ করেন যে, সম্প্রতি তার সম্পদের বিষয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, তবে তা অতিরঞ্জিত। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, ফ্ল্যাটটি ব্যাংক ঋণ নিয়ে ক্রয় করা হয়েছে এবং তার স্কুলের বেতন, কোচিং থেকে প্রাপ্ত আয় এবং গ্যারেজের ভাড়া থেকে আয় দিয়ে কিস্তি পরিশোধ করা হয়। সব খরচ মেটিয়ে তিনি মাসে সামান্য সঞ্চয় করতে পারতেন।
পুলিশের মতে, ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত প্রমাণ এবং ফ্ল্যাটের নিরাপত্তা ক্যামেরার রেকর্ড বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তদন্তের প্রথম পর্যায়ে কোনো সন্দেহভাজন চিহ্নিত করা যায়নি, তবে ফরেনসিক রিপোর্ট এবং সাক্ষ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সন্দেহভাজন নির্ধারণের প্রচেষ্টা চলমান। বর্তমানে মামলাটি ডিপার্টমেন্টাল তদন্তের অধীনে রয়েছে এবং আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জানানো মতে, পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ পেট্রোল বাড়ানো হবে এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। একই সঙ্গে, শোকাহত পরিবারকে মানসিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
এই ঘটনার পর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। আজিজুলের পরিবার এখন ধানমন্ডির ছোট বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মামলার অগ্রগতি এবং সন্দেহভাজনের ধরন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা প্রকাশ করবে।



