গাজা উপত্যকায় অব্যাহত অবরোধের ফলে হাসপাতালগুলোতে মৌলিক চিকিৎসা সামগ্রী ও বিদ্যুতের অভাব বাড়ছে, ফলে রোগীদের জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান কঠিন হয়ে পড়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল‑বারশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ইসরায়েলের সীমাবদ্ধতা ও সরবরাহ চেইনের বাধা গাজা অঞ্চলে চিকিৎসা সামগ্রীর প্রবেশকে নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিয়েছে, যা রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে।
হাসপাতালের অভ্যন্তরে দেখা যায় শূন্য শেলফে কোনো ওষুধের প্যাকেট নেই, অপারেশন থিয়েটারের সরঞ্জামগুলো আংশিকভাবেই কাজ করছে। যদিও শয্যা ও রোগী সংখ্যা অপরিবর্তিত, তবু স্যালাইন, অ্যানেস্থেটিক, গজ, ডায়ালাইসিসের যন্ত্রপাতি ইত্যাদির ঘাটতি রোগীর সঠিক চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত করছে। রোগীর বেডে বসে থাকা সত্ত্বেও, প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে চিকিৎসকরা প্রায়শই রোগীর অবস্থার উন্নতি নিশ্চিত করতে পারেন না।
মুনির আল‑বারশ জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই বর্তমানে অনুপলব্ধ। স্যালাইন দ্রবণ, অবশ করার ওষুধ, গজের মতো মৌলিক উপকরণে তীব্র ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা শল্যচিকিৎসা ও জরুরি সেবাকে প্রভাবিত করছে। ডায়ালাইসিসের জন্য প্রয়োজনীয় ফিল্টার ও তরলও সীমিত পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে, ফলে কিডনি রোগীর চিকিৎসা প্রায়ই স্থগিত হতে বাধ্য হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতিও স্বাস্থ্যসেবার ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জেনারেটরের অপর্যাপ্ততা রোগীর রেকর্ডিং, ল্যাব টেস্ট এবং জরুরি শল্যচিকিৎসাকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিদ্যুৎ না থাকলে শীতলকরণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়, ফলে ওষুধের গুণগত মান হ্রাস পায় এবং রোগীর নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এই পরিস্থিতি হাসপাতালের কর্মীদের কাজের চাপ বাড়িয়ে তুলেছে এবং রোগীর সেবা মানকে হ্রাস করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গৃহীত সাময়িক যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও, গাজায় নির্ধারিত সংখ্যক চিকিৎসা সহায়তার ট্রাক প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে ইসরায়েল বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার সরবরাহিত ঔষধ ও চিকিৎসা সামগ্রী গাজায় পৌঁছাতে পারছে না, যা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সীমিত সহায়তা সত্ত্বেও, রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি রোগীরাও এই সংকটে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। গাজায় প্রায় চার হাজার গ্লকোমা রোগী স্থায়ী অন্ধত্বের হুমকির মুখে, এবং চল্লিশ হাজার গর্ভবতী নারী অনুপযুক্ত শর্তে বসবাস করছেন, যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। পাঁচ বছরের কম বয়সের প্রায় তিন লক্ষ দুই হাজার শিশুরা অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে রোগের হার বাড়াতে পারে। এইসব তথ্য গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত, যা বর্তমান মানবিক সংকটের মাত্রা প্রকাশ করে।
গাজার সীমান্তের বাইরে চিকিৎসা সেবার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত এক হাজার একশো ছাপনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। এছাড়া প্রায় বিশ হাজার রোগী, যার মধ্যে বহু শিশু রয়েছে, বিদেশে চিকিৎসার অনুমতির অপেক্ষা করছেন। এই সংখ্যা দেখায় যে, সীমান্ত বন্ধ থাকা অবস্থায় রোগীর জীবন রক্ষার জন্য জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা কতটা তীব্র।
মুনির আল‑বারশ অবিলম্বে সীমান্ত খুলে মানবিক সাহায্য ও রোগী স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, দেরি হলে আরও বেশি প্রাণ হারিয়ে যাবে এবং স্বাস্থ্য সংকটের পরিণতি দীর্ঘমেয়াদে গাজার জনসংখ্যার ওপর প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা এই সংকটের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।
গাজার স্বাস্থ্য কর্মীরা কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে রোগীর নিরাপত্তা ও সেবা মান বজায় রাখতে যথাযথ সহায়তা অপরিহার্য। পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, এই মানবিক সংকটের প্রতি দৃষ্টি রেখে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সরকারগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বলা হয়, যাতে গাজার রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে পারে এবং আরও ক্ষতি রোধ করা যায়।



