বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষার কাঠামো সীমিত, ফলে স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য নিজস্ব সঞ্চয়ের বিকল্প কমে যায়। এই ফাঁক পূরণে ব্যাংকগুলো বিভিন্ন সঞ্চয় পরিকল্পনা চালু করেছে, যার মধ্যে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) এর মিলিয়নিয়ার স্কিম উল্লেখযোগ্য।
মিলিয়নিয়ার স্কিমের মূল ধারণা হল নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসিক জমা দিয়ে নির্ধারিত সময় শেষে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত সংগ্রহ করা। স্কিমের শর্ত অনুযায়ী, মাসে ৪,৯৬১ টাকা জমা দিলে দশ বছরের শেষে মোট এক লক্ষ টাকা পাওয়া সম্ভব, তবে কর কেটে নেওয়ার পরে চূড়ান্ত পরিমাণ কমে যায়।
সঞ্চয়ের পরিকল্পনা শুরু করার আগে ব্যক্তির উচিত তার আয়-ব্যয়ের সমন্বয় করে কত টাকা সঞ্চয় করা যায় তা নির্ধারণ করা। লক্ষ্য নির্ধারিত হলে সীমিত আয়েও ধারাবাহিক সঞ্চয় সম্ভব হয়। অধিকাংশ মানুষ আগে ব্যয় করে পরে সঞ্চয় করার প্রবণতা দেখায়, যা এই স্কিমের সফল বাস্তবায়নে বাধা হতে পারে।
ইউসিবি এই স্কিমের জন্য পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত সময়সীমা প্রদান করে। সময়সীমা যত দীর্ঘ, মাসিক কিস্তি তত কম হয়; আর সময়সীমা কম হলে কিস্তি বাড়ে। উদাহরণস্বরূপ, যদি গ্রাহক দশ বছরের আগে লক্ষ টাকা সংগ্রহ করতে চান, তবে মাসিক কিস্তি প্রায় ৫,৮২২ টাকা হতে পারে।
আট বছরের মেয়াদে লক্ষ টাকা অর্জনের জন্য মাসিক কিস্তি প্রায় ৬,৯১৩ টাকা নির্ধারিত। একইভাবে, সাত বছরের জন্য কিস্তি ৮,৩৩৩ টাকা, ছয় বছরের জন্য ১০,২৪৬ টাকা এবং পাঁচ বছরের জন্য সর্বোচ্চ ১২,৯৪৯ টাকা হতে পারে। এই নমনীয়তা বিভিন্ন আয়ের স্তরের গ্রাহকদের জন্য উপযোগী।
স্কিমের কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট একটি তারিখে ডিপিএস (ডিপোজিট পেরিয়ডিক সেভিংস) অ্যাকাউন্ট খোলা হয় এবং একই তারিখে মাসিক কিস্তি জমা দিতে হয়। গ্রাহককে সাত দিনের গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হয়, যার মধ্যে কোনো জরিমানা ছাড়াই কিস্তি জমা দিতে পারে।
গ্রেস পিরিয়ডের পর কিস্তি বাকি থাকলে, ব্যাংক ডিপিএসের সুদের হারের ভিত্তিতে জরিমানা আরোপ করে। এছাড়া, ডিপিএস অ্যাকাউন্টটি যে শাখায় খোলা হয়েছে, সেই শাখায়ই কিস্তি জমা এবং সংশ্লিষ্ট সেবা গ্রহণ করা যায়।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয় পরিকল্পনা ব্যাংকের জন্য স্থিতিশীল তহবিল সরবরাহ করে, যা ঋণ প্রদানের ক্ষমতা বাড়ায়। একই সঙ্গে, গ্রাহকদের জন্য সুদভিত্তিক সঞ্চয়ের বিকল্প কম ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ে।
তবে, কর কেটে নেওয়া এবং সম্ভাব্য জরিমানা স্কিমের প্রকৃত রিটার্নকে প্রভাবিত করে। গ্রাহকদের উচিত করের প্রভাব এবং সুদের হার বিবেচনা করে সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা, যাতে প্রত্যাশিত রিটার্নের সাথে সামঞ্জস্য থাকে।
দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয় পরিকল্পনা সাধারণত মুদ্রাস্ফীতি এবং সুদের হার পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকে। যদি মুদ্রাস্ফীতি দ্রুত বাড়ে, তবে জমা করা মূলধনের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। তাই, গ্রাহকদের উচিত সময়ে সময়ে স্কিমের শর্তাবলি পুনর্বিবেচনা করা।
ইউসিবি এর মিলিয়নিয়ার স্কিমের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ব্যাংকও সমজাতীয় পণ্য চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক সুদের হার এবং নমনীয় কিস্তি কাঠামো গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে পারে, যা ব্যাংকিং খাতে নতুন সঞ্চয় সংস্কৃতি গড়ে তুলবে।
সামগ্রিকভাবে, এই স্কিম স্বল্প আয়ের গোষ্ঠীর জন্য সঞ্চয়ের একটি বাস্তব বিকল্প প্রদান করে, তবে কর, জরিমানা এবং মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবকে বিবেচনা না করলে প্রত্যাশিত লক্ষ্যের অর্জন কঠিন হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা এবং সময়মত কিস্তি প্রদানই সফলতার চাবিকাঠি।
ভবিষ্যতে, যদি সরকার সামাজিক সুরক্ষার কাঠামো শক্তিশালী করে এবং কর নীতি সহজ করে, তবে এই ধরনের সঞ্চয় স্কিমের চাহিদা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে, ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ সেবা প্রদান করা উচিত, যাতে সঞ্চয়ের সংস্কৃতি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখে।



