মার্চের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের শিকাগোতে ন্যাশনাল গার্ড পাঠানোর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। আদালতের অস্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের জাতীয় গার্ডকে ফেডারালাইজ করার ক্ষমতা কেবল “অসাধারণ” পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য হতে পারে। শিকাগো ও ইলিনয় রাজ্যের স্থানীয় ও রাজ্য কর্মকর্তাদের আপত্তি সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ন্যাশনাল গার্ড মূলত রাজ্যভিত্তিক সেনাবাহিনী, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বড় আকারের প্রতিবাদ বা জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা করে। সাধারণত গার্ডের নিয়ন্ত্রণ রাজ্য শাসকের হাতে থাকে, তবে ফেডারেল সরকার জরুরি অবস্থায় তা ব্যবহার করতে পারে। এই কাঠামোই আদালতকে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রভাবিত করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন শিকাগোতে গার্ড মোতায়েনের অনুমতি চেয়েছিল, কারণ শহরে ফেডারেল ইমিগ্রেশন রেইডের প্রতিবাদে বিশাল জনসমাবেশ ঘটছিল। স্থানীয় ও রাজ্য কর্তৃপক্ষের মতে, গার্ডের উপস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বাড়াবে। এ বিষয়ে উভয় পক্ষের মতবিরোধ স্পষ্ট ছিল।
শিকাগোর পরিস্থিতি নিয়ে দুইটি নিম্ন আদালত ইতিমধ্যে ট্রাম্পের দাবিকে খারিজ করে। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের জেলা আদালত এবং পরে আপিল আদালত উভয়ই গার্ডের মোতায়েনকে “বিদ্রোহ বা বিদ্রোহের হুমকি” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এই রায়গুলো ট্রাম্পের আপিলের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
সুপ্রিম কোর্টের ৬-৩ ভোটে নিম্ন আদালতের রায় বজায় রাখা হয়। বিচারকরা লিখেছেন, “এই প্রাথমিক পর্যায়ে সরকার ইলিনয়েতে আইন প্রয়োগের জন্য সামরিক বাহিনীর অনুমোদন পাওয়ার কোনো স্পষ্ট ভিত্তি চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।” এই মন্তব্য আদালতের মূল যুক্তি তুলে ধরে।
বিচারক ক্ল্যারেন্স থমাস, স্যামুয়েল আলিটো ও নিল গর্সুচ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তারা যুক্তি দেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সংবিধানিকভাবে স্পষ্ট এবং আদালতকে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। তবু তাদের মতামত সর্বমোট ভোটে অগ্রগতি পায়নি।
ইলিনয় রাজ্যের গভর্নর জে.বি. প্রিটজকার এই রায়কে “ইলিনয় এবং আমেরিকান গণতন্ত্রের জন্য বড় জয়” বলে প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই সিদ্ধান্ত শহরের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করবে এবং ফেডারেল হস্তক্ষেপের সীমা নির্ধারণ করবে। প্রিটজকারের মন্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ছাড়া কেবল রায়ের প্রভাব তুলে ধরে।
শিকাগোর পাশাপাশি নিউ অর্লিন্স, পোর্টল্যান্ড এবং ওয়াশিংটন ডিসি-তে ট্রাম্পের প্রশাসন একই রকম গার্ড মোতায়েনের চেষ্টা করেছিল। এসব শহরে প্রধানত ডেমোক্র্যাটিক শাসন ছিল এবং ফেডারেল ইমিগ্রেশন রেইডের বিরোধিতা করা প্রতিবাদকারীদের মোকাবিলার জন্য গার্ডের ব্যবহার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গার্ডের ব্যবহারকে অপরাধ হ্রাস, শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তার অভিবাসন নীতি কার্যকর করার জন্য অপরিহার্য বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটিক নিয়ন্ত্রিত শহরগুলোতে সহিংসতা বাড়ছে এবং ফেডারেল শক্তি প্রয়োজন। এই যুক্তি আদালতে যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি।
ট্রাম্পের পক্ষে গার্ড মোতায়েনকে “বিদ্রোহ বা বিদ্রোহের হুমকি” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, যা সংবিধানিকভাবে সামরিক হস্তক্ষেপের অনুমোদন দেয়। তবে নিম্ন আদালত ও সুপ্রিম কোর্ট উভয়ই এই দাবিকে অস্বীকার করে, কারণ প্রমাণের অভাব এবং আইনি ভিত্তি অনুপস্থিতি ছিল। ফলে গার্ডের মোতায়েনের অনুমোদন বাতিল হয়।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় শিকাগোতে বর্তমান অবস্থা বজায় রাখে এবং গার্ডের কোনো নতুন মোতায়েনকে বাধা দেয়। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ফেডারেল সরকারকে গার্ডের ব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্ট আইনি অনুমোদন ছাড়া এগিয়ে যাওয়া যাবে না। এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অনুরূপ অনুরোধের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স পয়েন্ট হয়ে দাঁড়াবে।
ট্রাম্পের দল এখনো এই রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়নি, তবে তারা সম্ভবত উচ্চতর আদালতে পুনর্বিবেচনা চাইতে পারে। অন্যদিকে, ইলিনয় সরকার গার্ডের উপস্থিতি ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য স্থানীয় পুলিশ ও জরুরি সেবা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা জানিয়েছে।
এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বড় শহরে গার্ড মোতায়েনের সম্ভাবনা কমে যাবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। আদালতের সিদ্ধান্ত ফেডারেল ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে কোনো রাষ্ট্রে গার্ডের ফেডারালাইজেশন ঘটলে, একই ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, সুপ্রিম কোর্টের ৬-৩ ভোটে ট্রাম্পের শিকাগোতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, যা রাজ্য স্বায়ত্তশাসন ও ফেডারেল ক্ষমতার সীমা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় হিসেবে বিবেচিত হবে।



