লিবিয়ার সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আলি আহমেদ আল-হাদ্দাদ এবং তার সঙ্গে চারজন অন্য ব্যক্তি তুর্কি রাজধানী আঙ্কারার বিমানবন্দর থেকে উড়ে যাওয়া একটি ফ্যালকন ৫০ জেটের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। দুর্ঘটনা ঘটেছে রাত ২০:৫২ টায় (স্থানীয় সময়), যা টেকঅফের ৪২ মিনিট পর ঘটেছে।
বিমানটি ট্রিপোলি গন্তব্যে উড়ছিল এবং সংযোগ হারানোর আগে জরুরি অবতরণ আবেদন করেছিল। তুর্কি অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী আলি ইয়েরলিকায়া টুইটারে জানিয়েছেন যে জেটের সিগন্যাল হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় এবং তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে।
লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনার পর প্রকাশ্যে জানিয়েছেন যে জেনারেল আল-হাদ্দাদ নিহত হয়েছেন এবং তার পরিবারকে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে এই ক্ষতি লিবিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য বড় ধাক্কা।
আঙ্কারার বিমানবন্দর থেকে টেকঅফের পর বিমানটি উচ্চ উচ্চতায় পৌঁছায় এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে জরুরি অবতরণ অনুরোধ পাঠায়। তবে, সংযোগ হারানোর পর বিমানটি আর কোনো সিগন্যাল পাঠাতে পারে না, ফলে তুর্কি বিমানবাহিনীর অনুসন্ধান দল তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করে।
জেনারেল আল-হাদ্দাদ লিবিয়ার জাতীয় সামরিক বাহিনীর (LNA) প্রধান কমান্ডার হিসেবে ২০২২ সাল থেকে দায়িত্বে আছেন। তিনি তুর্কি সমর্থিত সরকারী বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখেন এবং লিবিয়ার উত্তর-পশ্চিমে নিরাপত্তা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
লিবিয়ার দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে, তার মৃত্যু দেশীয় সংঘাতের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান সময়ে লিবিয়ার দুই প্রধান শাসন গোষ্ঠী—ইস্তিবলিস সরকার এবং হাউস অফ মেজলিসের সমর্থিত বাহিনী—মধ্যস্থতা ও সমঝোতার পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। সেনা প্রধানের অকাল মৃত্যু এই প্রক্রিয়াকে জটিল করতে পারে।
তুর্কি-লিবিয়ান সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দৃঢ় হয়েছে। তুরস্ক লিবিয়ার স্বীকৃত সরকারকে সামরিক প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম এবং বিমানবাহিনীর সহায়তা প্রদান করে আসছে। এই দুর্ঘটনা তুর্কি-লিবিয়ান কূটনৈতিক সংলাপের ওপর অপ্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে তুর্কি সরকারকে নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
অঞ্চলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—যেমন সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং ইয়েমেনের মানবিক সংকট—এও বাহ্যিক শক্তির হস্তক্ষেপের ফলে জটিলতা বাড়ে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, লিবিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষে হঠাৎ পরিবর্তন ঘটলে প্রতিবেশী দেশগুলোর কূটনৈতিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
একজন কূটনৈতিক সূত্র উল্লেখ করেছেন, “লিবিয়ার সামরিক নেতৃত্বের অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন তুর্কি-লিবিয়ান সহযোগিতার ধারাবাহিকতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চুক্তির ওপর প্রশ্ন তুলতে পারে।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তুর্কি সরকারকে দ্রুত তদন্ত ও সমন্বয়মূলক পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষকও বলেন, “এই ধরনের বিমান দুর্ঘটনা কেবল একক ঘটনার চেয়ে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ এটি লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ শক্তি ভারসাম্যকে পরিবর্তন করে এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের মাত্রা পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে।” তিনি লিবিয়ার শান্তি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য ত্রিপক্ষীয় সংলাপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
তুর্কি কর্তৃপক্ষ বর্তমানে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা সংস্থার সহায়তা চেয়েছে এবং লিবিয়ার সরকারকে ফলাফল জানাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। লিবিয়ার সরকারও দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি, জেনারেল আল-হাদ্দাদের পরিবর্তে নতুন কমান্ডার নিয়োগের পরিকল্পনা জানিয়েছে, যাতে নিরাপত্তা কাঠামোর ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
এই দুর্ঘটনা লিবিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক দৃশ্যপটের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে কী ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সমাধানে কী প্রভাব ফেলবে, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে থাকবে।



