২০২৫ সালে সাইবার অপরাধীরা ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে সর্বোচ্চ পরিমাণ চুরি করেছে, মোট ক্ষতি প্রায় ২.৭ বিলিয়ন ডলার রেকর্ডে পৌঁছেছে। এই পরিমাণে বহু হ্যাকিং ঘটেছে, যার মধ্যে কয়েকটি বড় এক্সচেঞ্জ ও বিকেন্দ্রীকৃত আর্থিক (DeFi) প্রকল্প লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
বায়বিট, দুবাই ভিত্তিক একটি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ, এই বছরের সবচেয়ে বড় হ্যাকের শিকার, যেখানে হ্যাকাররা প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলারের সমমানের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি করেছে। এই চুরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (FBI) এবং ব্লকচেইন বিশ্লেষণ সংস্থা দুজনই উত্তর কোরিয়ার সরকারী হ্যাকার গোষ্ঠীর দায়িত্ব নির্দেশ করেছে।
বায়বিটের পর, ২০২২ সালে রোনিন নেটওয়ার্ক এবং পলি নেটওয়ার্কে যথাক্রমে ৬২৪ মিলিয়ন ও ৬১১ মিলিয়ন ডলার চুরি হয়েছিল, যা পূর্বে সর্বোচ্চ চুরি হিসেবে বিবেচিত ছিল। তবে ২০২৫ সালের এই নতুন রেকর্ড, ঐ দুই ঘটনার তুলনায় দ্বিগুণের বেশি ক্ষতি নির্দেশ করে।
ব্লকচেইন পর্যবেক্ষণ সংস্থা চেইনালাইসিস এবং টিআরএম ল্যাবস উভয়ই ২০২৫ সালে মোট চুরির পরিমাণ ২.৭ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করেছে। চেইনালাইসিস আরও জানিয়েছে যে, ব্যক্তিগত ক্রিপ্টো ওয়ালেট থেকে অতিরিক্ত ৭ লক্ষ ডলার চুরি হয়েছে। একই সময়ে, ওয়েব৩ নিরাপত্তা সংস্থা ডি.এফ.আই.র রেক্ট ডাটাবেসও একই পরিমাণ চুরি রিপোর্ট করেছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার দল ২০২৫ সালে এককভাবে কমপক্ষে ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ক্রিপ্টো চুরি করেছে। চেইনালাইসিস ও এলিপটিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে এই গোষ্ঠী মোট প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার চুরি করে আসছে, যা তাদের আর্থিক সহায়তা হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র প্রোগ্রামের জন্য ব্যবহার করা হয়।
বছরের অন্যান্য বড় হ্যাকের মধ্যে রয়েছে সিটাস নামের বিকেন্দ্রীকৃত এক্সচেঞ্জের ওপর আক্রমণ, যেখানে হ্যাকাররা প্রায় ২২৩ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ চুরি করেছে। ইথেরিয়াম ভিত্তিক ব্যালেন্সার প্রোটোকলেও ১২৮ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া পেমেক্স এক্সচেঞ্জে ৭৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি ক্রিপ্টো চুরি হয়েছে।
এইসব হ্যাকের পর, আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একত্রে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন এবং বিভিন্ন দেশের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা হ্যাকারদের শনাক্তকরণ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য তথ্য শেয়ার করছে।
বায়বিটের ক্ষেত্রে, এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা ইতিমধ্যে ব্যবহারকারীদের ক্ষতি সীমিত করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্তে সহযোগিতা করছে।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণ সংস্থাগুলো হ্যাকারদের ব্যবহার করা পদ্ধতি ও রুটিন সম্পর্কে বিশদ তথ্য প্রকাশ করেছে, যা ভবিষ্যতে একই ধরনের আক্রমণ রোধে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে, হ্যাকাররা স্মার্ট কন্ট্রাক্টের দুর্বলতা ও অপ্রতুল নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করে বড় পরিমাণ সম্পদ চুরি করেছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, ক্রিপ্টো বাজারের দ্রুত বৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অপর্যাপ্ততা হ্যাকারদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে। তাই, এক্সচেঞ্জ ও DeFi প্রকল্পগুলোকে শক্তিশালী নিরাপত্তা প্রোটোকল, নিয়মিত অডিট এবং ব্যবহারকারী সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
এই হ্যাকিং ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক আর্থিক নিরাপত্তা সংস্থার দৃষ্টিতে বড় উদ্বেগের বিষয়, কারণ ক্রিপ্টো সম্পদের বড় পরিমাণ চুরি মানবজাতির আর্থিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
অবশেষে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত চলমান থাকায়, ভবিষ্যতে হ্যাকারদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।



