জাপান সরকার বিদেশিদের নাগরিকত্ব প্রাপ্তির শর্তে বড় পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত। নতুন প্রস্তাব অনুসারে, নাগরিকত্বের জন্য আবেদনকারীকে কমপক্ষে দশ বছর জাপানে বসবাস করতে হবে, যা বর্তমানে নির্ধারিত পাঁচ বছরের দ্বিগুণ। পাশাপাশি, স্থায়ী বসবাসের জন্যও জাপানি ভাষা দক্ষতা এবং সামাজিক আচরণকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে যুক্ত করা হবে।
এই সংস্কার পরিকল্পনা যুক্তরাজ্যভিত্তিক “ইন্ডিপেনডেন্ট” পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে জাপানের অভিবাসন নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন কার্যকর হতে পারে। সরকারী জোটের অংশীদার দল নিপ্পন ইশিন বর্তমান নাগরিকত্ব নীতিকে অতিরিক্ত শিথিল বলে সমালোচনা করে, ফলে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দেন।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) এক বৈঠকে ৪ ডিসেম্বর উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব অনুমোদন শুধুমাত্র বসবাসের সময়ের ওপর নির্ভর করবে না। আবেদনকারীর আচরণ, জীবিকা নির্বাহের সক্ষমতা এবং আয়ের স্থায়িত্বও মূল্যায়নের অংশ হবে। এই মানদণ্ডের মাধ্যমে সরকার দীর্ঘমেয়াদী বাসিন্দাদের সমাজে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে চায়।
নিপ্পন ইশিনের পক্ষ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর বিচার মন্ত্রণালয়ের কাছে আরও কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়। প্রস্তাবে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা সীমিত করা এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের সম্ভাবনা রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে, অতি ডানপন্থী সানসেইতো পার্টি এই প্রস্তাবকে আরও কঠোর করে তোলার দাবি জানায়, যা দেশের অভিবাসন নীতি নিয়ে বিতর্ককে তীব্রতর করেছে।
প্রস্তাবিত নিয়মে কিছু ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছে। জাপানে বহু বছর ধরে ক্রীড়া ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বকারী খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে দশ বছরের বসবাসের শর্ত পূরণ না করলেও নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে। বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট ১২,২৪৮টি নাগরিকত্ব আবেদন দাখিল হয়েছে, যার মধ্যে ৮,৮৬৩টি অনুমোদিত হয়েছে। এই সংখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে নাগরিকত্বের চাহিদা ক্রমবর্ধমান, তবে নতুন শর্তগুলো আবেদনকারীদের জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের জন্য জাপানি ভাষা ও নাগরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে। সরকার এই পদক্ষেপকে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করছে, যাতে বিদেশি বাসিন্দারা স্থানীয় সংস্কৃতি ও আইনগত কাঠামো সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে পারে। এই নীতি সমর্থকরা যুক্তি দেন, দীর্ঘমেয়াদী বাসিন্দাদের জন্য ভাষা ও আচরণ সংক্রান্ত শর্ত যুক্তিসঙ্গত এবং সমাজে মসৃণ সংহতি নিশ্চিত করবে।
অন্যদিকে, সমালোচকরা সতর্ক করেন যে শ্রম ঘাটতি মোকাবেলায় জাপানকে অভিবাসন উৎসাহিত করা প্রয়োজন, আর নতুন শর্তগুলো রক্ষণশীল সরকারের দ্বারা অভিবাসন নিরুৎসাহিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে, ভাষা ও নাগরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা শ্রমিকদের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় এবং সময়সাপেক্ষ হতে পারে, যা কর্মসংস্থান বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এই প্রস্তাব নিয়ে তীব্র বিতর্ক গড়ে উঠেছে। সমর্থকরা দীর্ঘমেয়াদী বাসিন্দাদের জন্য শর্তগুলো যুক্তিসঙ্গত বলে দাবি করেন, আর বিরোধীরা নতুন বাধা শ্রমিক ঘাটতি বাড়িয়ে তুলবে বলে সতর্ক করেন। এই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে জাপানের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা নীতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের অবস্থান।
আসাহি শিম্বুনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হল বিদেশিদের ভাষা দক্ষতা ও মৌলিক সামাজিক ধারণা শক্তিশালী করা, যাতে তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকার নাগরিকত্ব ও স্থায়ী বসবাসের শর্তগুলোকে সামাজিক সংহতির একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো যদি অনুমোদিত হয়, তবে জাপানের নাগরিকত্ব নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কঠোর হবে এবং আবেদন প্রক্রিয়ায় নতুন মানদণ্ড যুক্ত হবে। সরকারী দলগুলোর মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে মতবিরোধ অব্যাহত থাকবে, এবং পরবর্তী ধাপে সংসদে সংশ্লিষ্ট বিলের আলোচনা প্রত্যাশিত। নাগরিকত্ব ও স্থায়ী বসবাসের শর্তে এই পরিবর্তনগুলো দেশের অভিবাসন নীতি ও শ্রম বাজারের উপর কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে।



