২০২৫ সালের পুরো সময়কালে বাংলাদেশের পোশাক উৎপাদনকারীরা ট্যারিফের ওঠানামা, আর্থিক চাপ এবং অবকাঠামো সমস্যার মুখোমুখি হয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বদলে বারবার সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রযোজ্য শুল্কের অস্থিরতা, যা দেশের রপ্তানি আয়ের ভিত্তি।
এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের ওপর ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। পূর্বে ১৬.৫ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে এই নতুন হার যুক্ত হয়ে মোট শুল্ক ৫৩.৫ শতাংশে পৌঁছায়। শুল্কের এই তীব্র বৃদ্ধি রপ্তানিকারকদের খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং ক্রেতাদের জন্য পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়, ফলে বৈশ্বিক চাহিদা ইতিমধ্যে দুর্বল অবস্থায় আরও চাপের মুখে পড়ে।
শুল্কের পরিবর্তন এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, এবং আগস্টে নতুন স্তরে স্থিতিশীল হয়। তবে এই সময়ের মধ্যে ইতিমধ্যে মার্জিনের ক্ষতি এবং অর্ডার পরিকল্পনার বিঘ্ন ঘটেছে, যা উৎপাদন লাইনকে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদী সমন্বয় করতে বাধ্য করে।
বহিরাগত অস্থিরতার পাশাপাশি দেশীয় আর্থিক ও অবকাঠামোগত সমস্যাও গার্মেন্টস শিল্পকে প্রভাবিত করেছে। ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার কর্মধারার মূলধনকে সংকুচিত করে, ফলে উৎপাদনকারীরা নগদ প্রবাহ বজায় রাখতে সমস্যার সম্মুখীন হয়। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়মিততা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে, বিশেষ করে বড় মাপের কারখানাগুলোর জন্য এই সমস্যার প্রভাব বেশি।
ইন্ডিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনা পুরো বছর জুড়ে চলতে থাকে, যা লজিস্টিক ও কাঁচামাল সংগ্রহে জটিলতা বাড়িয়ে দেয়। সীমান্ত পারাপার প্রক্রিয়ার বিলম্ব এবং শুল্ক নীতির পরিবর্তন সরবরাহ শৃঙ্খলকে অস্থিতিশীল করে, ফলে উৎপাদন সময়সূচি প্রায়ই পরিবর্তন করতে হয়।
অক্টোবর মাসে ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যেখানে গার্মেন্টস নমুনা, আমদানি করা আনুষঙ্গিক এবং কাঁচামাল ধ্বংস হয়। এই ক্ষতি কয়েক মিলিয়ন ডলারের সমান বলে অনুমান করা হয়, যা সরাসরি রপ্তানি সক্ষমতা এবং গ্রাহকের আস্থা হ্রাসের দিকে নিয়ে যায়।
সম্প্রতি শ্রমিক নিয়মকানুন কঠোর হয়েছে, যা উৎপাদনকারীদের অতিরিক্ত ব্যয় এবং কর্মশক্তি ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মজুরি সংক্রান্ত বিধি মেনে চলা এখন অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও আর্থিক বোঝা তৈরি করেছে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ যদি সর্বনিম্ন উন্নত দেশ (LDC) ক্লাব থেকে বেরিয়ে যায়, তবে “মেড ইন বাংলাদেশ” পণ্যের জন্য বর্তমান বিশেষ বাজার সুবিধা হারিয়ে যাবে। এই পরিবর্তন রপ্তানিকারকদের শুল্কের হার বাড়িয়ে দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।
গার্মেন্টস রপ্তানিকারকরা ২০২৫ সালের ফলাফলকে অস্থিরতা ও মার্জিনের হ্রাসের বছর হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন, যদিও কিছু পণ্যের রপ্তানি পরিমাণে সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। তারা ২০২৬ সালে উন্নতি আশা করছেন, তবে তা রাজনৈতিক সময়সূচি ও ক্রেতাদের আচরণের ওপর নির্ভরশীল, কোনো কাঠামোগত সমস্যার স্বয়ংক্রিয় সমাধান নয়।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, লজিস্টিক বাধা এবং শ্রমিক নীতির কঠোরতা গার্মেন্টস শিল্পকে বহু দিক থেকে চাপে ফেলেছে। ভবিষ্যতে ২০২৬ সালে LDC থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনগুলো শিল্পের পুনরুদ্ধারকে নির্ধারণ করবে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় রপ্তানিকারকদের কৌশলগত পরিকল্পনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্গঠন প্রয়োজন হবে।



