প্রায় ৯০,০০০ কঙ্গো শরণার্থী বুরুন্ডির সীমান্তবর্তী শিবিরে বসতি স্থাপন করেছে, যেখানে খাবার ও পানির অভাব, অতিরিক্ত ভিড় এবং মৌলিক সেবার সীমিততা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। এই শিবিরগুলোতে মানবিক সংস্থা ও জাতিসংঘের এজেন্সিগুলো তীব্র সহায়তা প্রদান করছে, তবে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে।
মার্চের শুরুর দিকে পূর্ব কঙ্গোর M23 বিদ্রোহী দল উইভারা শহর দখল করে, যা বুরুন্ডি সীমান্তের খুব কাছাকাছি। যদিও কয়েক দিন পর তারা প্রত্যাহার করে, তবে এই আক্রমণ শত শত হাজার মানুষকে তাদের বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করে। উইভারা দখলের পরপরই দক্ষিণ কিভু প্রদেশে প্রায় অর্ধ মিলিয়ন মানুষই স্থানচ্যুত হয়েছে, এবং এই সংখ্যার মধ্যে বহু পরিবার শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
বুরুন্ডির উত্তর-পশ্চিমে ন্ডাভা শিবিরে প্রতিদিন গড়ে ২০০ রোগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। শিবিরের পরিবেশ অতিরিক্ত ভিড়পূর্ণ, খাবার ও পরিষ্কার পানির সরবরাহ অনিয়মিত, ফলে শরণার্থীদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি বাড়ছে।
একজন চিকিৎসা প্রকল্প সমন্বয়ক জানান, “আমরা এমন মানুষদের দেখছি যারা হতাশা, ক্লান্তি ও দুর্ভোগে ভুগছে। শরণাপন্ন নারীরা গর্ভবতী অবস্থায় শিবিরে পৌঁছে, কেউ কেউ আমাদের ক্লিনিকে সন্তান প্রসব করে।” এই পরিস্থিতি স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে এবং রোগের বিস্তার বাড়িয়ে তুলছে।
মেডিকেল চ্যারিটি MSF উল্লেখ করেছে যে, শিবিরে কোভিডের পরেও কলেরা, হাম এবং ম্যালেরিয়া মতো সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। পরিষ্কার পানির অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এই রোগগুলোকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে, যা শরণার্থীদের মধ্যে বিশেষভাবে দুর্বল গোষ্ঠী—শিশু ও গর্ভবতী নারী—কে প্রভাবিত করবে।
জাতিসংঘের বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি (WFP) ২১০,০০০ শরণার্থীর জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং নতুন আগত ৭১,০০০ কঙ্গো শরণার্থীর জন্য ট্রান্সিট সেন্টারে গরম খাবার সরবরাহ করছে। তবে এই সহায়তা বজায় রাখতে ত্রৈমাসিক তহবিলের তীব্র প্রয়োজন রয়েছে, কারণ বর্তমান আর্থিক ঘাটতি সেবার ধারাবাহিকতা হুমকির মুখে ফেলছে।
শিবিরের আশেপাশের অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত। স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো লুট হয়েছে, ওষুধের সরবরাহ বন্ধ, এবং স্কুলগুলো বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার ক্ষতি ঘটাবে, যা শরণার্থীদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, বুরুন্ডিতে শরণার্থীদের অবনতি মানবিক সংকটকে রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। বুরুন্ডি সরকার বর্তমানে শরণার্থীদের স্বাগত জানিয়ে সীমানা নিরাপদ রাখতে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে, তবে সীমিত সম্পদ ও অবকাঠামোর অভাবে দেশীয় চাপ বাড়ছে।
আফ্রিকান ইউনিয়নের শান্তি ও নিরাপত্তা মিশনও এই সংকটের দিকে নজর দিচ্ছে এবং বুরুন্ডি ও কঙ্গোর সরকারকে সমন্বিত মানবিক প্রতিক্রিয়া গড়ে তুলতে আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) বিশেষভাবে শিশু ও গর্ভবতী নারীর সুরক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে এবং ত্রৈমাসিক তহবিলের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “এই ধরনের বৃহৎ মানবিক সংকট শুধুমাত্র কঙ্গো ও বুরুন্ডির সীমান্তে নয়, পুরো গ্রেট লেকস অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে। ত্বরিত আর্থিক সহায়তা এবং সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ছাড়া পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত পদক্ষেপ না হলে শরণার্থীদের ওপর রোগের বিস্তার এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।
আসন্ন সপ্তাহগুলোতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এই বিষয়টি আলোচনার সূচিতে রয়েছে, যেখানে তহবিলের বরাদ্দ এবং দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। মানবিক সংস্থাগুলোও ত্রৈমাসিক তহবিলের জন্য ত্বরিত দান আহ্বান জানাচ্ছে, যাতে শিবিরে মৌলিক সেবা বজায় রাখা যায় এবং রোগের বিস্তার রোধ করা যায়।
শরণার্থীদের বর্তমান অবস্থা এবং মানবিক সহায়তার ঘাটতি আন্তর্জাতিক দায়িত্বের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। সময়মতো সমন্বিত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বুরুন্ডি ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর নিরাপত্তা ও সামাজিক কাঠামোতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে।



