নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের জাতীয় নির্বাচনের জন্য নতুন আচরণবিধি জারি করে, যার মধ্যে পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রার্থী ও দলগুলো আর বাড়ি, রাস্তা, বাজার কিংবা গাছের তলে পোস্টার ঝুলিয়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারবে না। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এবং টেলিভিশন সংলাপের জন্যও বিশেষ ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
পূর্বে পোস্টার ছিল নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান হাতিয়ার; প্রার্থীর নাম, প্রতীক এবং স্লোগান দিয়ে ভিড়ের মনোযোগ আকর্ষণ করা হতো। তবে পরিবেশগত ক্ষতি এবং পোস্টারের ওপর একে অপরের পোস্টার চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের কথা বিবেচনা করে কমিশন এই পরিবর্তন এনেছে।
নির্বাচন কমিশন গত বছরের নভেম্বর মাসে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধা চূড়ান্ত করে, এরপর ১০ নভেম্বর সংশোধিত বিধিমালা গেজেটে প্রকাশ করে। সংশোধিত বিধিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী পোস্টার ব্যবহার করতে পারবে না।
প্রথমবারের মতো সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহার নিয়েও নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করা হয়েছে; অনলাইন ক্যাম্পেইনের সময় কন্টেন্টের সত্যতা, বিজ্ঞাপন সীমা এবং ডেটা সুরক্ষার বিষয়গুলোকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়াও টেলিভিশনে একটি সংলাপের আয়োজন করা হবে, যেখানে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও আচরণবিধি নিয়ে আলোচনা হবে।
তফসিল ঘোষণার পরই কমিশন কঠোরভাবে বিধি মানা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেয়, ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিধি লঙ্ঘনের জন্য জরিমানা আরোপের ঘটনা ঘটেছে। এই জরিমানা প্রার্থীদের সতর্ক করার পাশাপাশি নতুন নিয়মের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
পোস্টার নিষেধের পেছনে পরিবেশগত উদ্বেগ প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। লেমিনেটেড পোস্টারগুলো বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে, আর কালি ফসলের ক্ষেত্রের ক্ষতি করে বলে কমিশনের কর্মকর্তারা ব্যাখ্যা করেছেন। এসব প্রভাব বিবেচনা করে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আর কোনো প্রার্থী পোস্টার ব্যবহার করতে পারবে না।
আখতার আহমেদ, যিনি এই বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, বলেন যে পোস্টারের ওপর অন্যের পোস্টার চাপিয়ে দেওয়া প্রায়ই সংঘর্ষের কারণ হয়। এই ধরনের বিরোধ এড়াতে এবং শান্তিপূর্ণ প্রচারণা নিশ্চিত করতে আচরণবিধিতে সংশোধন আনা হয়েছে।
ইসি সচিবও উল্লেখ করেছেন যে, এক প্রার্থীকে দুইবার একই ধরনের লঙ্ঘনের জন্য সতর্ক করা সত্ত্বেও তিনি পুনরায় অপরাধ করেছেন, ফলে কমিশন আইনের প্রয়োগ করে জরিমানা আরোপ করেছে। এই উদাহরণটি নতুন বিধির কঠোরতা ও প্রয়োগের দৃঢ়তা প্রকাশ করে।
সংশোধিত আচরণবিধি অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণার সময় কোনো বাস, ট্রাক, নৌযান, মোটরসাইকেল বা অন্য কোনো যান্ত্রিক যানবাহন ব্যবহার করে মিছিল, জনসভা বা শোডাউন করা যাবে না। যানবাহনসহ বা যানবাহন ছাড়া কোনো ধরনের মশাল মিছিলও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
টর্চ মিছিল, শোডাউন এবং অন্যান্য ধরণের জনসমাবেশের ওপরও কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়ও কোনো মিছিল বা শোডাউন করা যাবে না, যা প্রচারণার সময়সূচি ও পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনে।
ভোটের দিনেও যান চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে; ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে কোনো গাড়ি, ট্রাক বা অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করা যাবে না, যাতে ভোটারদের নিরাপদে ভোট দেওয়া নিশ্চিত হয়।
এই নতুন বিধিমালা দেশের প্রথম পোস্টারবিহীন জাতীয় নির্বাচনের সূচনা করবে। রাজনৈতিক দলগুলো এখন সামাজিক মিডিয়া, টেলিভিশন এবং সরাসরি ভোটার সংযোগের ওপর বেশি নির্ভর করতে বাধ্য হবে। নির্বাচনী প্রচারণার এই রূপান্তর ভবিষ্যতে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তি ও অংশগ্রহণের পদ্ধতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে।



