রাশিয়া সোমবার রাত থেকে ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি শহরে বিশাল আকারের আক্রমণ চালায়, যার ফলে কমপক্ষে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে চার বছর বয়সী এক শিশুও অন্তর্ভুক্ত। আক্রমণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়, ফলে বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
উক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী জানায়, রাশিয়া ৬০০টিরও বেশি ড্রোন এবং প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এই আক্রমণ পরিচালনা করেছে। আক্রমণটি ক্রিসমাসের আগে ঘটার ফলে উক্ত সময়ে শান্তি আলোচনার ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
উক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কি বলেন, “মানুষ শুধু তাদের পরিবারকে সঙ্গে রাখতে চায়, বাড়িতে থাকতে চায় এবং নিরাপদ থাকতে চায়।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাশিয়ার এই আক্রমণ তার অগ্রাধিকারকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে এবং বর্তমান শান্তি আলোচনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। জেলেনস্কি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সমালোচনা করে বলেন, “পুতিন এখনও স্বীকার করতে পারছেন না যে তাকে হত্যা বন্ধ করতে হবে, এবং এর অর্থ বিশ্ব রাশিয়ার ওপর যথেষ্ট চাপ দিচ্ছে না।”
ঝিটোমিরের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে একটি শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তা ভিটালি বুনেচকো জানান, শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে ডাক্তাররা তার জীবন রক্ষা করতে পারেননি। একই আক্রমণে আরও পাঁচজন আহত হয়েছে।
কিয়েভ অঞ্চলে ৭৬ বছর বয়সী এক মহিলার মৃত্যু এবং তিনজনের আঘাতের খবরও জানানো হয়েছে; আক্রমণটি একটি বাড়িকে লক্ষ্যবস্তু করে ঘটেছে। খমেলনিটসকির পশ্চিম ইউক্রেনে একটি আক্রমণে ৭২ বছর বয়সী একজন ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে, যা আঞ্চলিক প্রশাসনের প্রধান সারহি তিউরিনের মতে নিশ্চিত হয়েছে।
পোল্যান্ডের ফাইটার জেটগুলোও পশ্চিম ইউক্রেনে রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির প্রতিক্রিয়ায় প্রস্তুত করা হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করে, তারা বিদ্যুৎ সুবিধা এবং অন্যান্য পরিবহন অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এই তথ্য রাশিয়ার রাষ্ট্র সংবাদ সংস্থা তাসের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকে রাশিয়ার স্ট্রাভোপলের একটি পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টে ড্রোন আক্রমণ চালানোর তথ্যও প্রকাশ পেয়েছে। রাশিয়ার ভ্লাদিমির ভ্লাদিমিরভো গভার্নর জানান, ড্রোনের আঘাতে প্ল্যান্টে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তবে কোনো প্রাণহানি রিপোর্ট করা হয়নি এবং পার্শ্ববর্তী আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটো রাশিয়ার এই বিস্তৃত আক্রমণকে নিন্দা করেছে এবং ইউক্রেনকে অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান আক্রমণাত্মক নীতিকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে তাপমাত্রা -৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে, যা বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহের বিঘ্ন এবং শীতল আবহাওয়া উভয়ই নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এই আক্রমণটি রাশিয়ার পূর্বে ক্রিসমাসের সময়ে বড় আকারের আক্রমণ চালানোর স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছেন। তারা উল্লেখ করেন, রাশিয়া এই সময়ে আক্রমণ বাড়িয়ে তুলতে চায় যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া যায় এবং শান্তি আলোচনার গতি ধীর হয়।
সামগ্রিকভাবে, রাশিয়ার এই সাম্প্রতিক আক্রমণ ইউক্রেনের মানবিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে কঠিন করে তুলেছে। শান্তি আলোচনার ধারাবাহিকতা এবং মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা এখন আরও তীব্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।



